শ্রমিক আন্দোলন
আলোচনার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রক্রিয়া চলমান: শ্রমমন্ত্রী

শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো ইতোমধ্যে সরকারের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে। মজুরি বোর্ডে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে এবং আলোচনার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
বুধবার (৪ নভেম্বর) শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা জানান। এ সময় শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে শ্রমিকদের আগামী দিন থেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমমন্ত্রী বলেন, গাজীপুরে শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিহতের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পরিবারটির পাশে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভিডিও ফুটেজসহ শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গাজীপুরের টঙ্গীতে শ্রমিকদের জন্য ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। এ বিষয়ে অনুমোদিত সারসংক্ষেপ তার কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটির প্রক্রিয়াগত কাজ শুরু করা হবে। শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব উদ্যোগও গ্রহণ করছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে চলমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সংকট নিরসনে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টার নোটিশে শ্রমিক নেতারা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। একইভাবে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারাও দিন-রাত বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় উপস্থিত হয়েছেন। শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের এই সহযোগিতার মাধ্যমে শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব শ্রমিক নির্দোষ হয়েও কারাবরণ করেছেন, তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। অন্যদিকে, যাদের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ ভিডিও ফুটেজে রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শনিবার রাতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর রোববার দুপুর ১২টার আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। একই দিন সন্ধ্যার মধ্যে গেজেটও প্রকাশ করা হয়। এরপরও বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে সরকার আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। আজকের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী চার দিনের মাথায় আবারও মজুরি বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগলেও বর্তমান সরকার দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি এবং মালিকদের শিল্প পরিচালনার সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করাই সরকারের লক্ষ্য। শিল্পকারখানা টিকে থাকলে উৎপাদন ও আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হবে।
দাবি-দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে অথবা লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাতে হবে। কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে সাড়া না দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ধরনের আবেদন বা আলোচনা ছাড়া সরাসরি কর্মবিরতি কিংবা অচলাবস্থা সৃষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অন্যদিকে, যেসব কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় খুলে দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করার জন্য মালিকপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি শ্রমিক নেতাদের নিজ নিজ এলাকার কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করার অনুরোধ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন শ্রমমন্ত্রী।
শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পকে বাংলাদেশ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা কিংবা শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যারা দেশের শিল্প ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করে আইনগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও কেউ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ডের সুপারিশ মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষ মেনে নেবে। কারণ, বোর্ডে দুই পক্ষেরই প্রতিনিধি রয়েছে এবং তারা ইতিমধ্যে সুপারিশ মেনে নেয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বানে সাড়া না দিলে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষ সহযোগিতা করলে শ্রমিকরাও কাজে ফেরার আহ্বানে সাড়া দেবেন বলে তিনি আশা করছেন।
সবশেষে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে শিল্পকারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আহ্বান জানান শ্রমমন্ত্রী।
ভোরের আকাশ/ এনউব