জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সংশোধনে সংসদে প্রতিবেদন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই তা বাস্তবায়নে দ্রুত এগোতে চায় সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে জাতীয় সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির কাজ এগিয়ে নিতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি বৈঠক করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এসব মতামত নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরি করে জাতীয় সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সনদের বাইরে জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিপূরক প্রস্তাব এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
কমিটির সভাপতি জানান, প্রতিবেদন তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আলোচনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করাই কমিটির লক্ষ্য।
এর আগে জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি করে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির কার্যপরিধিতেও সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলকে মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি দল সরাসরি প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। কয়েকটি দল থেকে একাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। একটি দল লিখিত বক্তব্য দিয়েছে, আরেকটি দলের প্রতিনিধিরা অসুস্থতা ও পারিবারিক কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৭টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল।
লিখিত বক্তব্য দেওয়া দল হিসেবে এবি পার্টির নাম উল্লেখ করেন তিনি। অসুস্থতার কারণে অংশ নিতে না পারা দল হিসেবে জাতীয় গণফ্রন্টের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কথাও জানান।
তিনি বলেন, যারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি, তারাও আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে কমিটির দরজা খোলা থাকবে। নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল লিখিতভাবে কোনো প্রস্তাব দিলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য কমিটির নেই। যারা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, তারা নিজেদের বক্তব্য ও প্রস্তাব দিয়েছেন। যারা এখনো আসেননি, তারাও লিখিত প্রস্তাব দিতে পারবেন। প্রয়োজন হলে তাদের আবারও আলোচনায় ডাকা হতে পারে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ও আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলো যেসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। আর যেসব বিষয়ে কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলোও সংশ্লিষ্ট ভিন্নমতসহ বিবেচনায় রাখা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবও বিশেষ কমিটি বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি।
অর্থবছর পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে বর্ষাকাল পড়ে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা ও সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ হচ্ছে। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান তিনি।
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উচ্চকক্ষ ১০০ সদস্যের হবে—এ বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও সদস্য নির্বাচন বা প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
কেউ সংসদে পাওয়া আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলেছেন, আবার কেউ ভোটের আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উচ্চকক্ষ ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজ্য প্রতিনিধিত্বকারী কক্ষের মতো হবে না। বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়ার ধারণাও আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে বিলটি গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।
সংবিধান একটি চলমান রাষ্ট্রীয় দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজের প্রয়োজন ও জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবকিছু স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়।
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে ছয়টি সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। তাই পুরোনো সব প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনলে প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলে লিখিতভাবে দিলে তা বিবেচনা করা হবে।
বৈঠকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নাম নিয়েও একটি প্রস্তাব এসেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’-এর বাংলা অনুবাদ নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ বা অনুরূপ নাম ব্যবহারের প্রস্তাব কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এসেছে। বিষয়টি আগে আলোচিত হলেও নতুন করে প্রস্তাব আসায় তা কমিটির নোটে রাখা হবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ১৩ জুলাই ২০২৬ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব যুক্ত করে কমিটিকে ১৭ সদস্যে পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
রোববারের বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/জেআ