বন্দরে পড়ে থাকা সাড়ে ৬ হাজার কনটেইনার ধ্বংসের উদ্যোগ

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে পড়ে থাকা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কনটেইনার ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কনটেইনার নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কনটেইনার বন্দরের বিশাল জায়গা দখল করে রাখায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরকে গতিশীল করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির অষ্টম বৈঠক শেষে সংসদ ভবনে অবস্থিত মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুও উপস্থিত ছিলেন।
চিফ হুইপ বলেন, আজ সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০টি কনটেইনার দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কনটেইনারে পণ্য থাকার কথা থাকলেও সেগুলো খালি পাওয়া গেছে। আবার কিছু কনটেইনারে পানি পাওয়া গেছে। প্রায় ৩৩ বছর ধরে এসব কনটেইনারের অনেকগুলো পড়ে রয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কনটেইনার নিষ্পত্তি করা হবে।
তিনি বলেন, এসব কনটেইনার বন্দরের বিশাল জায়গা দখল করে রেখেছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে এবং বন্দরকে গতিশীল করতে এসব কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
৪র্থ সংসদ অধিবেশন নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, আগামীকাল থেকে শুরু হয়ে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। আজকের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিবেশনে তিনটি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া একটি বিল হাতে পাওয়া গেছে। আরও দুই-একটি বিল আসতে পারে। এসব বিষয়ে অধিবেশনে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। অধ্যাদেশগুলো ইতোমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে তাঁদের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। প্রয়োজন হলে আলোচনার জন্য সময় বাড়ানো হবে। অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বসহ অন্যান্য কার্যক্রমও থাকবে।
তিনি বলেন, আমাদের হাতে তিনটি অধ্যাদেশ এসেছে। এগুলো হলো সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্কসংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং বিশেষ সৌরবিদ্যুৎসংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
অধ্যাদেশগুলো স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে। কমিটি এক বা দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পারে। সেখানে সামান্য কিছু শব্দ বা অক্ষরের পরিবর্তন হতে পারে। তবে মূল বিষয়বস্তুতে বড় কোনো পরিবর্তন নেই।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদের তৃতীয় পৃষ্ঠায় স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কারসমূহ বাস্তবায়ন করা হবে। সেখানে কী কী সংস্কার করা হবে, তার তালিকাও দেওয়া আছে। সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি সংসদের বাইরে বাস্তবায়নের কোনো পথ নেই। এটাই সমঝোতা।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি সুপারিশ দেওয়ার পর বিষয়টি সংসদে আসবে। সেখানে বিরোধী দল তাদের মতামত দেবে, সরকারও নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর সংসদীয় পদ্ধতিতে আলোচনা হবে। প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গেলে সংবিধান সংশোধন পাস হবে।
বিরোধী দল কেন সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে আলাদা কমিটি গঠন করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তাদের কাছেই করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকে সরকারি অর্থ জমা ও উৎসাহ বোনাস নিয়ে আলোচনা
চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে জমা রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আমানত হিসেবে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি। এ বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সরকারি অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ খাতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার মতো ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে।
পায়রা বন্দরের ড্রেজিং নিয়ে প্রশ্ন
পায়রা বন্দরের ড্রেজিং নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকার প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিংয়ের কাজ করেছে। প্রকল্পের আওতায় ৫ দশমিক ৮ মিটার গভীরতা থেকে ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা করার সিদ্ধান্ত ছিল। সে অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর পরিমাপ করে দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের গভীরতার তুলনায় আরও কমে গেছে। অর্থাৎ ড্রেজিংয়ের পরও সেখানে গভীরতা বাড়েনি, বরং কমেছে। এ ধরনের বিষয় বৈঠকে উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রেও পরিমাণের চেয়ে বেশি সরবরাহ, কম সরবরাহ কিংবা নির্ধারিত কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও ৫০টি পণ্য সরবরাহের আদেশ দিয়ে ৫০০টি সরবরাহ করা হয়েছে, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম সরবরাহ করা হয়েছে। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বন্দরের কার্যক্রম দ্রুত করার উদ্যোগ
চিফ হুইপ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, আগে যেখানে পণ্য খালাসে প্রায় ৭০ দিন সময় লাগত, তা কমিয়ে ৪০ দিনে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আগের বৈঠকের পর থেকে বর্তমানে সময় কমে প্রায় ৪৯ দিনে এসেছে। এটি আরও কমিয়ে ৪০ দিনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া বন্দর থেকে কনটেইনার বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কারা দায়ী, তা শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কনটেইনার বের হওয়ার সময় সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত এবং আইন মেনে কাজ হয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা হবে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের একসঙ্গে বসা প্রসঙ্গে
দীর্ঘদিন পর সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে বৈঠকে বসেছেন উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, সংসদীয় কার্যক্রমে সবাইকে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সংসদে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে বসবে, আলোচনা করবে—এটাই নিয়ম এবং সংসদীয় সংস্কৃতি।
তিনি বলেন, দেশ আমাদের সবার। এখানে কে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন বা ভবিষ্যতে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু দেশটা আমাদের। তাই সাংবাদিকদের প্রতিও অনুরোধ, আপনারা এমনভাবে লিখবেন, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যায়।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশের সব সমস্যা সংসদে নিয়ে আসা হবে এবং সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা হবে। সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এ সময় বন্দরের কনটেইনার ধ্বংসের বিষয়ে হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বলেন, ৩৩ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে এসব কনটেইনার পড়ে রয়েছে। এ সময়ে কত চেয়ারম্যান, বোর্ডের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এত বছরেও এসব কনটেইনার সরানোর বিষয়ে কারও মধ্যে প্রয়োজনীয় উপলব্ধি তৈরি হয়নি। ৩৩ বছর আগের পণ্য এখনো বন্দরে পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব কনটেইনার বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে রেখেছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কনটেইনারের মধ্যে ৪ হাজার ১০০টি ধ্বংস বা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি কনটেইনারগুলোও পরিষ্কার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্দর দেশের সম্পদ, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্পদ। তাই এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার। শুধু আইন প্রণয়ন করাই নয়, দেশের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সচল রাখা যায়, সে বিষয়েও সংসদের দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।