এবার এক্সপ্রেসওয়ে যাচ্ছে বিমানবন্দরে

রাজধানী ঢাকার ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থার একটি সমন্বিত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও পাতাল মেট্রোরেল। এর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হবে।
বর্তমানে রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর কিংবা উত্তরবঙ্গ থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে যাত্রীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যানজট। বিশেষ করে আব্দুল্লাহপুর, কাওলা ও বিমানবন্দর সড়কের দীর্ঘ যানজটের কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরতে যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টা আগেই বাসা থেকে বের হতে হয়। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সরাসরি তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই সমস্যার বড় ধরনের সমাধান মিলতে পারে। ফলে আশুলিয়া, সাভার, বাইপাইল, ধউর কিংবা উত্তরবঙ্গ থেকে আসা যাত্রীরা শহরের অভ্যন্তরীণ যানজট এড়িয়ে সরাসরি বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবেন। এতে ভ্রমণের সময় কমবে, অনিশ্চয়তা কমবে এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও উন্নত হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, দীর্ঘ ছয় মাসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেল ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও, প্রকল্পটির নতুন সংযোজনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এখন আর শুধু একটি উড়াল সড়ক নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংশোধিত প্রকল্পে তিনটি নতুন সংযোগ যুক্ত হয়েছে—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ (পাতাল মেট্রোরেল) এবং বাইপাইল ইন্টারসেকশন। এই তিনটি সংযোজন রাজধানী ও দেশের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
বিমানবন্দরে যাতায়াতে বদলে যাবে চিত্র
বর্তমানে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ বিমানবন্দরে যেতে গাবতলী, মিরপুর কিংবা উত্তরা হয়ে রাজধানীর যানজটপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করেন। ফলে দূরত্বের তুলনায় যাতায়াতের সময় অনেক বেশি লাগে। এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে ঢাকা-আশুলিয়া করিডোর থেকে সরাসরি বিমানবন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, বিদেশগামী শ্রমিক এবং প্রবাসীদের জন্য এটি হবে বড় সুবিধা।বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল মূলত আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নির্মিত হচ্ছে। এর সঙ্গে দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়ে সংযুক্ত হওয়ায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
মেট্রোরেলের সঙ্গে প্রথম সমন্বিত সংযোগ
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ বা পাতাল মেট্রোরেলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। বাংলাদেশে এতদিন সড়ক ও রেলভিত্তিক গণপরিবহন আলাদা পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে। ফলে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যেতে যাত্রীদের আলাদা যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন সংযোগের ফলে একজন যাত্রী উত্তরাঞ্চল থেকে এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে বিমানবন্দর এলাকায় এসে খুব সহজেই মেট্রোরেলে উঠে মতিঝিল, কমলাপুর কিংবা রাজধানীর অন্য এলাকায় যেতে পারবেন।
অন্যদিকে, রাজধানীর ভেতরের যাত্রীরাও মেট্রোরেল ব্যবহার করে বিমানবন্দর এলাকায় এসে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে আশুলিয়া, সাভার কিংবা উত্তরাঞ্চলের দিকে যাত্রা করতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটিই হবে ঢাকায় প্রথম প্রকৃত ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি’, যেখানে একাধিক পরিবহন ব্যবস্থা একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে।
বাইপাইল ইন্টারসেকশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাইপাইল দেশের অন্যতম ব্যস্ত শিল্প ও পণ্য পরিবহন কেন্দ্র। এখানে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক এবং আশুলিয়া অঞ্চলের শিল্পাঞ্চলের যানবাহন একত্রিত হয়। নতুন ইন্টারসেকশন নির্মাণ হলে ভারী যানবাহনের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল হবে। ঢাকা ইপিজেড, সাভার ও আশুলিয়ার শত শত শিল্পকারখানার পণ্য দ্রুত রাজধানী ও বিমানবন্দরে পৌঁছানো সহজ হবে। এর ফলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি সময়ও সাশ্রয় হবে।
লাভবান হবে পুরো অর্থনীতি
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো, বাইপাইল হয়ে সাভারের শ্রীপুর পর্যন্ত যাবে। এটি চালু হলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি নতুন দ্রুতগতির করিডোর তৈরি হবে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা কিংবা সিরাজগঞ্জ অঞ্চল থেকে আসা যানবাহন রাজধানীর অভ্যন্তরে না ঢুকেই বিমানবন্দর কিংবা চট্টগ্রামমুখী করিডোরে প্রবেশ করতে পারবে। ফলে রাজধানীর অভ্যন্তরীণ সড়কের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
শিল্পাঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনা
সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও গাজীপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। তৈরি পোশাক, ওষুধ, প্লাস্টিক, চামড়া ও বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পের হাজার হাজার কনটেইনার প্রতিদিন এই অঞ্চল থেকে রাজধানী ও বন্দরের দিকে যায়। যানজটের কারণে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি সময়মতো পণ্য সরবরাহও ব্যাহত হয়। এক্সপ্রেসওয়ে, তৃতীয় টার্মিনাল ও মেট্রোরেলের সমন্বিত সংযোগ শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য একটি আধুনিক লজিস্টিক করিডোর তৈরি করবে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।
নাগরিকদের কী সুবিধা মিলবে
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নাগরিকরা কয়েকটি বড় সুবিধা পাবেন— বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত। মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের মধ্যে সহজ সংযোগ। রাজধানীর যানজট এড়িয়ে উত্তরাঞ্চলে দ্রুত যাতায়াত। শিল্পাঞ্চল থেকে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমবে। বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়বে। ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন আবাসন ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। জ্বালানি অপচয় ও যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা কমবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখন আর কেবল একটি উড়াল সড়ক প্রকল্প নয়। তৃতীয় টার্মিনাল, এমআরটি লাইন-১ এবং বাইপাইল ইন্টারসেকশনের সংযোজন এটিকে রাজধানীর ভবিষ্যৎ সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত করেছে। যদি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয় এবং পরিকল্পিত সংযোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করবে না; বরং বিমানবন্দর, মেট্রোরেল, শিল্পাঞ্চল ও জাতীয় মহাসড়ককে এক সুসংহত নেটওয়ার্কে যুক্ত করে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নগরজীবনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভোরের আকাশ/এমএইচ