প্রবাসীদের স্বপ্ন বুনন

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক ও পেশাজীবীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সেবা সহজ করা, দেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কার্ডে একাধিক সরকারি ও আর্থিক সুবিধা এক প্ল্যাটফর্মে মিলবে। এছাড়া প্রবাসীরা দেশে ফিরে পুনর্বাসন, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সূত্র বলছে, ১৭০টির বেশি দেশে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে। গত বছর বিদেশে কর্মী গেছেন ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন। এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান আরও কার্যকরভাবে মূল্যায়ন এবং তাদের জন্য সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রবাসীবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সরকার প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী হিসেবে নয়, বরং দেশের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে তাদের জন্য সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়কমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যে প্রবাসীদের কল্যাণে আধুনিক ও সমন্বিত সেবা চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সরকারি সেবা সহজ করা, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে তিনি প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থানেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, প্রবাসীদের জন্য সেবা সহজ হলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
প্রবাসী কার্ডে যেসব সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা: সরকারি পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি হিসেবে নিবন্ধিত পরিচয় বহন করবে এই কার্ড। ফলে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে পরিচয় যাচাই সহজ হবে। দ্রুত সরকারি সেবা; প্রবাসী কল্যাণ, জনশক্তি, পাসপোর্ট, এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবায় দ্রুত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্যাংকিং সুবিধা; সরকারি নীতিমালার আওতায় ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ, রেমিট্যান্স সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বিশেষ আর্থিক সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে বিনিয়োগে সহায়তা; প্রবাসীদের শিল্প, আবাসন, কৃষি বা অন্যান্য খাতে বিনিয়োগে তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা সহজ করার উদ্যোগ রয়েছে।
কল্যাণমূলক সেবা; যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া সহজ হবে। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন; দেশে ফিরে কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। বিশেষ তথ্যসেবা; সরকারি বিভিন্ন সেবা, নতুন নীতিমালা, চাকরির সুযোগ এবং জরুরি নির্দেশনা ডিজিটালভাবে জানার সুবিধা মিলতে পারে। দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন; ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন, ঋণ এবং কর্মসংস্থান সহায়তার ক্ষেত্রে সমন্বিত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি সহজ হবে; বিদেশে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা বা অভিযোগ দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অগ্রাধিকার; প্রবাসীদের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন সরকারি সুবিধার সঙ্গে এই কার্ড যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও নীতিনির্ধারকরা উল্লেখ করেছেন।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা: বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও উৎসাহ সৃষ্টি হতে পারে। একইসঙ্গে সরকারি সেবায় হয়রানি কমবে, তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ সহজ হবে এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য একটি সমন্বিত ডাটাবেস গড়ে উঠবে। এর ফলে প্রবাসীদের
চাহিদা অনুযায়ী নতুন কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করাও সহজ হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের উৎপাদনশীল খাতে সম্পৃক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
বাস্তবায়নে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্ডটির নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা, অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা চালু করা এবং অন্যান্য সরকারি ডাটাবেসের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। একইসঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রবাসীদের কল্যাণে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সমন্বিত ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা, যাতে তারা সহজে সরকারি ও ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন এবং দেশের উন্নয়নে আরও কার্যকরভাবে অবদান রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী খুব শিগগিরই প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং তাদের জন্য সরকারি সেবাকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা: বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশির প্রত্যাশা, প্রবাসী কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাস্তব অর্থে সরকারি সেবা সহজ করবে। বিশেষ করে বিমানবন্দর সেবা, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, কল্যাণ তহবিল, পুনর্বাসন এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অগ্রাধিকারমূলক সেবা নিশ্চিত হলে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে বলে তারা মনে করেন।
কুমিল্লার সৌদি প্রবাসী রাজিব আহমেদ বলেন, প্রবাসী কার্ডের সফল বাস্তবায়ন হলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। একইসঙ্গে প্রবাসীদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
বিদেশে কর্মীর সংখ্যা: সরকারি তথ্য অনুসারে গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। একজন করে কর্মী গেছেন ১৩টি দেশে। ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। যেসব দেশে ১০০ জনের কম অভিবাসী কর্মী যান, সেসব দেশকে অভিবাসনের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা শোভন নয়। ‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫: অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার। অন্তত ৮-১০টি বাজারে নিয়মিত কর্মী পাঠানোর অবস্থা থাকা উচিত। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু।
এতে বলা হয়, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এবার অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। এ সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন।
এরপর কাতারে ১০ শতাংশ, ৬ শতাংশ সিঙ্গাপুরে, কুয়েতে ৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৪ শতাংশ কর্মী গেছেন। তবে ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কতজন কর্মী বিদেশে গেছেন, তার হিসাব থাকলেও ফিরে আসা কর্মীর হিসাব নেই। তাই বিদেশে মোট কতজন কর্মী আছেন, তা জানা যায় না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিবছর লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। করোনার প্রভাবে ২ বছর কমলেও ২০২২ সালে আবার এ সংখ্যা লাখ ছাড়ায়। এরপর থেকে আবার কমছে।
কাতার, ব্রুনেই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত, হংকং ও জাপানেও নারী অভিবাসন ঘটেছে। তবে হংকং ও জাপানের মতো গন্তব্যে নারী অভিবাসীর সংখ্যা খুব কম ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, ঘরের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা নারী অভিবাসনকে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করছে। তবে রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে ঘরের বাইরের কাজে অংশগ্রহণকে পুনরায় সীমিত করছে কি না, তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ২৫২টি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, আরও ৩০০ প্রক্রিয়াধীন। আগে তো দুর্নীতি করে লাইসেন্স দেওয়া হতো, এখন তাহলে দেওয়া হলো কেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, দক্ষতা বাড়াতে পারছে না বলেই নতুন শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলে বাজার খুঁজতে হবে না।
রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার। গত বছর ৪ হাজার ৬৬৩ জন দেশটিতে গেছেন। আগের বছর যান ৯৯৩ জন। ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসী সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে একটি চক্র। এই চক্রের একাংশ রাশিয়ার অসাধু চক্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এই সংখ্যা গত বছর ইতালিতে আগত দেশগুলোর অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রবাসীরা সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ