মালয়েশিয়া সফরের অর্জন তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দেশটির সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সফর সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর, যা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সফর শেষে কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও সফরসঙ্গীরা সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা জানান, প্রায় ১৮ ঘণ্টার এ সফরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
## উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
মালয়েশিয়ায় পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানো হয়। সফরকালে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক, সীমিত পরিসরের বৈঠক এবং প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন। এছাড়া মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজার সঙ্গেও তার সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
## ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি
দুই দেশের আলোচনার পর ৩৩ দফা সমন্বিত একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
## বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তি, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে হালাল শিল্পের উন্নয়ন ও এ খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
## শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার সরকারের কাছে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কম খরচে, স্বচ্ছ ও নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের কল্যাণ, অবৈধভাবে অবস্থানরত শ্রমিকদের বৈধতা প্রদান কিংবা মানবিক উপায়ে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
## শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌথ গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
## প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
## রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে মালয়েশিয়া। এছাড়া আসিয়ান ও অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
## সাংস্কৃতিক সহযোগিতা
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বিনিয়োগ ও সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত দুটি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় করা হয়েছে।
## ঐতিহাসিক মাইলফলক
সফরসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে বহুমাত্রিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
দুই দেশের সরকারপ্রধান ভবিষ্যতে পারস্পরিক সফর ও সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
ভোরের আকাশ/জেআ