পানির মতো ছোট দানেও রয়েছে বড় সওয়াব

পানি মহান আল্লাহর অন্যতম বড় নেয়ামত। মানুষের জীবনধারণ থেকে শুরু করে পশুপাখির বেঁচে থাকা, উদ্ভিদের বেড়ে ওঠা এবং প্রকৃতির সজীবতা বজায় রাখতে পানির গুরুত্ব অপরিসীম।
তৃষ্ণার্ত কাউকে এক গ্লাস পানি পান করানোও হতে পারে সওয়াব অর্জনের মাধ্যম। ইসলামে পানি পান করানোকে বিশেষ মর্যাদার সদকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামি শিক্ষায় মানুষের পাশাপাশি প্রাণীর তৃষ্ণা নিবারণকেও সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। হাদিসে এমন ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যেখানে একটি তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভ করেন।
এসব বর্ণনা সৃষ্টির প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
পানি পান করানোর বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একাধিক হাদিস রয়েছে।
সাহাবি হজরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোন সদকা উত্তম? উত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, ‘পানি পান করানো।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩৬৬৫)
অন্য একটি বর্ণনায় পানি পান করানোকে সর্বাধিক সওয়াবপূর্ণ সদকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ আত-তারগিবের ৯৬০ নম্বর হাদিসে এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও পানি পান করানোর ব্যবস্থা করা যায়। হজরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর মা উম্মে সাদ মৃত্যুবরণ করলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চান, মায়ের পক্ষ থেকে কোন সদকা উত্তম হবে। মহানবী (সা.) পানি পান করানোর কথা বলেন। এরপর সাদ (রা.) একটি কূপ খনন করে তা মায়ের নামে ওয়াকফ করেন। ঘটনাটি সুনানে আবু দাউদের ১৬৮৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
পানি পান করানোর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। তৃষ্ণার্ত কাউকে এক গ্লাস পানি দেওয়া, পথচারীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা কিংবা দরিদ্র ও পানিসংকটে থাকা মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেও এই নেক কাজ করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের উপকারের জন্য কূপ খনন, নলকূপ স্থাপন এবং জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী পানির ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
পানির উৎস তৈরির সওয়াব সম্পর্কেও হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমার ১২৯২ নম্বর হাদিসে কূপ খনন এবং সেখান থেকে মানুষ বা পাখির পানি পান করার বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানের কথা বর্ণিত হয়েছে।
এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ভালো কাজকেও সদকা হিসেবে গণ্য করার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। আল-আদাবুল মুফরাদের ৪২২ নম্বর হাদিসে উত্তম কথা বলা, অন্যকে সাহায্য করা, এক ঢোক পানি পান করানো এবং পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে সদকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনানে ইবনে মাজাহর ২৪৭৪ নম্বর হাদিসেও পানি পান করানোর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে পানির সহজলভ্যতা ও দুষ্প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় এনে তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দেওয়ার বিশেষ প্রতিদানের কথা বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামের এই শিক্ষা শুধু পরকালের সওয়াব অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সহমর্মিতারও প্রকাশ। বিশেষ করে গরমের সময়, দীর্ঘ পথযাত্রায় কিংবা নিরাপদ পানির সংকটে থাকা এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা মানুষের কষ্ট লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সামর্থ্য অনুযায়ী তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণীর জন্য পানির ব্যবস্থা করা, পানির অপচয় রোধ করা এবং সবার জন্য নিরাপদ পানির সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখা প্রত্যেকের জন্য কল্যাণকর উদ্যোগ। সামান্য একটি গ্লাস পানি কারও তাৎক্ষণিক কষ্ট দূর করতে পারে; আর মানুষের উপকারে স্থায়ী পানির উৎস তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সদকার মাধ্যম।
ভোরের আকাশ/জেআ