বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করা কি বাধ্যতামূলক?

আমাদের সমাজে বিয়ের পর মেয়েদের নামের শেষে বাবার পদবি (যেমন- চৌধুরী, শেখ, খন্দকার ইত্যাদি) বা নামের অংশ বাদ দিয়ে স্বামীর নাম বা পদবি যুক্ত করার একটি দীর্ঘকালীন রেওয়াজ রয়েছে। অনেকে একে কেবল একটি সামাজিক রীতি মনে করলেও, অনেক দ্বীনি ভাই-বোনের মনে প্রশ্ন জাগে—ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়টি আসলে কেমন? ইসলাম কি স্ত্রীকে স্বামীর পদবি বা নাম নিজের নামের সাথে জুড়ে দেওয়ার অনুমতি দেয়?
পবিত্র কোরআন এবং সহীহ হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে এই বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ইসলামে বংশীয় পরিচয় এবং পিতৃপরিচয় ধরে রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিছে ইসলামের আলোকে স্বামীর পদবি ব্যবহারের সঠিক বিধান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কোরআনের অমোঘ নির্দেশ: পিতৃপরিচয় পরিবর্তন হারাম
ইসলামের মূল মূলনীতি হলো, একজন মানুষের আসল পরিচয় তার বাবার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, স্বামীর মাধ্যমে নয়। বিয়ের মাধ্যমে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু এর ফলে স্ত্রীর বংশ বা পিতৃপরিচয় বদলে যায় না।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
“তোমরা তাদেরকে (সন্তানদের বা মানুষকে) তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। আল্লাহর কাছে এটাই ন্যায়সঙ্গত।” (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫)
এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার পর সাহাবিরা পালক সন্তানদেরও তাদের আসল বাবার নামে ডাকা শুরু করেছিলেন। সুতরাং, নাম বা পদবি পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি নিজের আসল বংশমর্যাদা বা পিতৃপরিচয় আড়াল হয়ে যায়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনুচিত।
২. হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি
নিজের আসল বাবা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা হিসেবে বা অন্য কোনো বংশকে নিজের বংশ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
হযরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন—
“যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজের পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা দাবি করল (বা নিজের পিতৃপরিচয় ত্যাগ করে অন্য বংশের পরিচয় দিল), সে কুফরি করল।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৩৫০৮)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি নিজের পিতা ব্যতীত অন্য কারো দিকে নিজের বংশকে সম্বন্ধ করল, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাকুল এবং মানবজাতির লানত (অভিশাপ)।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ২৬১১)
তাহলে কি স্বামীর নাম বা পদবি একেবারেই ব্যবহার করা যাবে না?
ইসলামী আইনজ্ঞ ও মুফতিদের মতে, বিষয়টি নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ধরণের ওপর। এখানে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে:
ক. যখন এটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম:
যদি কোনো নারী বিয়ের পর তার নামের শেষ থেকে নিজের বাবার নাম বা প্রকৃত বংশের পদবি পুরোপুরি মুছে ফেলেন এবং এমনভাবে স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন যার ফলে সমাজে বা কাগজপত্রে তার আসল পিতৃপরিচয় বা বংশ পরিচয় হারিয়ে যায় বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় (যেমন—লোকেরা মনে করতে পারে সে ওই বংশের মেয়ে)—তবে তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ।
খ. যখন এটি জায়েজ বা অনুমোদিত:
যদি শুধুমাত্র চেনার সুবিধার্থে বা সামাজিক কারণে নামের সাথে স্বামীর নাম বা পদবি যোগ করা হয়, যেখানে নিজের আসল পিতৃপরিচয় গোপন করার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না এবং সবাই জানে যে তিনি অমুকের মেয়ে—তাহলে তা নাজায়েজ হবে না।
যেমন: পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘নামের’ ঘরে নিজের আসল নাম রেখে ‘স্বামীর নাম’ (Husband's Name) এর আলাদা কলামে স্বামীর নাম লেখা সম্পূর্ণ জায়েজ।
অথবা কোনো নারী যদি তার আসল নামের পর সামাজিক পরিচয়ের জন্য "অমুকের স্ত্রী" (Wife of...) বা কথ্য ভাষায় স্বামীর নামের অংশ যুক্ত করেন, কিন্তু মনে-প্রাণে এবং কাগজপত্রে নিজের বাবার বংশকেই নিজের আসল পরিচয় মনে করেন, তবে তা গুনাহের কারণ হবে না। তবে তা পরিহার করাই উত্তম।
উম্মাহাতুল মুমিনীন ও নারী সাহাবিদের আদর্শ
আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন নবীপত্নী (উম্মাহাতুল মুমিনীন) এবং নারী সাহাবিগণ। হযরত আয়েশা (রা.), হযরত খাদিজা (রা.) কিংবা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.)—তাঁদের কাউকেই বিয়ের পর নামের শেষে ‘রাসূল’ বা ‘মুহাম্মদ’ পদবি বা নাম যুক্ত করতে দেখা যায়নি। তাঁরা সবসময় আয়েশা বিনতে আবু বকর (আবু বকরের মেয়ে আয়েশা), ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমা) নামেই পরিচিত ছিলেন এবং ইতিহাসে এভাবেই অমর হয়ে আছেন। বিয়ের পরও তাঁদের পিতৃপরিচয় অপরিবর্তিত ছিল।
ইসলাম নারীকে বিয়ের পর একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। বিয়ের পর একজন নারী তার বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী থাকে, স্বামীর বংশের নয়। তাই পশ্চিমা সংস্কৃতি বা অন্ধ সামাজিক অনুকরণে নিজের নামের গৌরবময় পিতৃপরিচয় বা বংশের পদবি মুছে ফেলা একজন মুসলিম নারীর জন্য উচিত নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্রে নিজের বাবার দেওয়া নাম ও বংশীয় পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখাই ইসলামের শিক্ষা এবং এটিই সবচেয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পথ।
ভোরের আকাশ/জেআ