কুকুর পালন নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী?

আমাদের সমাজে নিরাপত্তা বা শখের বশে অনেকেই বাড়িতে কুকুর পুষে থাকেন। তবে মুসলিম হিসেবে যেকোনো প্রাণী পোষার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামে ঢালাওভাবে ঘরের ভেতর কুকুর রাখা বা শখের বশে কুকুর পোষার ব্যাপারে কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, বিশেষ কিছু প্রয়োজনে কুকুর রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বাড়ি পাহারা দেওয়া, ফসল রক্ষা বা শিকারের উদ্দেশ্যে কুকুর পোষা যাবে কিনা—সে বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো:
মূল বিধান: পাহারা দেওয়ার জন্য কুকুর পোষা জায়েজ
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী—বাড়ি, ল্যান্ড বা খামার পাহারা দেওয়া, গবাদি পশু রক্ষা করা এবং শিকারের উদ্দেশ্যে কুকুর পোষা সম্পূর্ণ জায়েজ। শরিয়তসম্মত এই বিশেষ প্রয়োজনগুলোর কথা পবিত্র হাদিস শরিফে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি শিকার করা বা গবাদি পশু রক্ষা করা অথবা শস্যক্ষেত পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া (অন্য কোনো কারণে) কুকুর পুষবে, প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে দুই কিরাত (বিশাল পরিমাণ) নেকি কেটে নেওয়া হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৫৪৮১; সহীহ মুসলিম)
অন্য আরেকটি হাদিসে ঘর ও বাড়ি পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কুকুর রাখার বিষয়টিকেও এই অনুমতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং, চোর-ডাকাত বা শত্রুর হাত থেকে নিজের বাড়ি ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কেউ যদি বাড়িতে কুকুর পোষেন, তবে তা শরিয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ।
কুকুর পোষার ক্ষেত্রে ৩টি জরুরি শরিয়তি নিয়ম ও সতর্কতা:
নিরাপত্তার স্বার্থে কুকুর পোষা জায়েজ হলেও একজন মুসলমানকে অবশ্যই নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:
১. কুকুর ঘরের ভেতরে রাখা যাবে না
পাহারা দেওয়ার কুকুরকে সবসময় বাড়ির উঠানে, গেটে বা সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে নির্দিষ্ট খাঁচায় বা চত্বরে রাখতে হবে। কোনোভাবেই কুকুরকে শোবার ঘর, বসার ঘর বা রান্নাঘরের ভেতরে রাখা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“যে ঘরে কুকুর এবং (কোনো প্রাণীর) ছবি বা মূর্তি থাকে, সেই ঘরে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৩২২৫)
২. লালা ও অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা
কুকুরের লালা বা থুতু অত্যন্ত অপবিত্র (নাজাসাতে গালাজাহ)। কুকুর যদি কাপড়ে বা শরীরের কোথাও মুখ দেয় কিংবা তরল লালা লেগে যায়, তবে তা অপবিত্র হয়ে যাবে এবং সেই কাপড় পরে নামাজ হবে না।
- হাদিসের নির্দেশ: কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয় বা চাটে, তবে সেই পাত্রটিকে সাতবার পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং এর মধ্যে প্রথম বা শেষ বার মাটি দিয়ে মাঝতে হবে। তাই পাহারাদার কুকুরের সংস্পর্শে যাওয়ার পর ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে পবিত্র হয়ে নেওয়া জরুরি।
৩. শখের বশে বা ফ্যাশনের জন্য পোষা হারাম
বর্তমান যুগে কেবল শখ মেলাতে, আভিজাত্য প্রকাশ করতে কিংবা বিদেশি দামি জাতের কুকুর নিয়ে ঘরের ভেতর ড্রয়িংরুমে বা বিছানায় রাখা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ইসলামে কোনো প্রয়োজন ছাড়া (যেমন- পাহারা বা শিকার ব্যতীত) এভাবে কুকুর পোষা সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। এতে প্রতিদিন নিজের অর্জিত সওয়াব বা নেকি কমতে থাকে।
পারস্পরিক দয়া ও পরিনাম:
ইসলামে কুকুরকে অপবিত্র বলা হলেও তার ওপর কোনো রকম অত্যাচার করা বা তাকে ক্ষুধার্ত রাখা যাবে না। পাহারাদার কুকুরকে সময়মতো পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও আশ্রয় দেওয়া মালিকের দায়িত্ব। হাদিসে এসেছে, এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাআলা এক পাপিষ্ঠ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে জান্নাত দান করেছিলেন। সুতরাং, কুকুরকে কেবল নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তার প্রতি মানবিক আচরণ বজায় রাখতে হবে।
ভোরের আকাশ/জেআ