সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব কী?

মানবজীবনে যত রকমের আনন্দ, গৌরব ও প্রাপ্তি রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর ও শ্রেষ্ঠতম হলো সন্তানের বাবা-মা হতে পারা। একটি ফুটফুটে নবজাতকের নিষ্পাপ হাসি, তার আধো-আধো বুলি এবং ছোট্ট দুটি হাতের স্পর্শ নিমেষেই বাবা-মায়ের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয়। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, সন্তান কেবল বংশবৃদ্ধির মাধ্যম বা কোনো জাগতিক সম্পদ নয়; বরং সন্তান হলো মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক নেয়ামত, উপহার এবং একটি পবিত্র আমানত।
পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে সন্তান কেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এবং এ বিষয়ে বাবা-মায়ের দায়িত্ব কী, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পবিত্র কোরআনের আলোতে সন্তান: চোখের শীতলতা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সন্তানকে মানুষের জন্য এক বিশেষ সৌন্দর্য এবং আনন্দ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে মানুষের অন্তরকে তৃপ্ত করেন।
“ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হলো দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য।” (সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৪৬)
একজন মুমিনের কাছে সন্তান হলো আল্লাহর এমন এক দান, যার জন্য স্বয়ং নবী-রাসূলগণও আল্লাহর দরবারে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করেছিলেন। হযরত জাকারিয়া (আ.) এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.) বার্ধক্যে উপগত হয়েও আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁদের দোয়া কবুল করে সন্তান দান করেছিলেন। একজন আদর্শ মুমিনের দোয়ার বিবরণ দিতে গিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে:
“হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের ইমাম বানিয়ে দাও।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
২. মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম (সদকায়ে জারিয়া)
মানুষের মৃত্যুর পর যখন তার সমস্ত আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও দুনিয়া থেকে সওয়াব পাওয়ার একটি অনন্য মাধ্যম হলো নেক সন্তান। সন্তানের ভালো কাজ ও দোয়ার বরকতে মৃত বাবা-মায়ের কবরের আজাব মাফ হয় এবং জান্নাতে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়; কেবল তিনটি মাধ্যম ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম (জ্ঞান) যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৬৩১)
৩. কন্যাসন্তান: জান্নাতের সুসংবাদ
জাহেলি যুগে যেখানে কন্যাসন্তানের জন্মকে অভিশাপ ও অপমানের মনে করা হতো, ইসলাম এসে সেখানে নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। ইসলামে কন্যাসন্তানকে আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং তাদের উত্তম লালন-পালনের জন্য জান্নাতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তির তিনটি, দুটি বা একটি কন্যাসন্তান থাকে এবং সে তাদের উত্তম শিক্ষা ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে লালন-পালন করে বিয়ে দেয়, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।” (সুনানে তিরমিযী)
শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের সাথে যুক্ত বড় আমানত ও দায়িত্ব
সন্তান যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল পুরস্কার ও নেয়ামত, তেমনি এটি বাবা-মায়ের জন্য একটি বড় পরীক্ষাও (ফিতনাহ)। কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি বাবা-মাকে তাদের সন্তানের লালন-পালন ও শিক্ষার বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।
- দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা: সন্তানকে কেবল দামি স্কুলে পড়ানো বা বৈষয়িক সম্পদে বড় করাই বাবা-মায়ের একমাত্র কাজ নয়। তাদের মনে আল্লাহর ভয়, রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং হালাল-হারামের জ্ঞান গড়ে দেওয়া সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
- সদাচরণ ও অধিকার রক্ষা: সন্তানদের প্রতি স্নেহশীল হওয়া, তাদের মুখে হালাল রিজিক তুলে দেওয়া এবং সব সন্তানের মধ্যে (ছেলে ও মেয়ে) সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা ইসলামের অমোঘ বিধান।
আমাদের চারপাশে তাকালে দেখা যায়, কত দম্পতি এক ফালি সন্তানের হাসির জন্য বছরের পর বছর চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, আল্লাহর কাছে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। তাই যাদের ঘরে আল্লাহ এই সুন্দর নেয়ামত দিয়েছেন, তাদের উচিত প্রতিনিয়ত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। সন্তানকে অবহেলা না করে, তাদের সুনাগরিক এবং খাঁটি মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলাই হোক প্রতিটা বাবা-মায়ের প্রধান ব্রত। মহান আল্লাহ আমাদের সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা এবং পরকালের নাজাতের উসিলা বানিয়ে দিন। আমীন।
ভোরের আকাশ/জেআ