ভাদ্রে মাসে বাতাসে তালের ঘ্রাণ

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ভাদ্র মাসে বাজারে উঠতে শুরু করেছে পাকা তাল। পাকা তালের মিষ্টি সুবাসে ম-ম করছে হাট-বাজার। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে তালের পিঠা। কেউ পাকা তালের মিষ্টি ঘন রস কাঁচা খান, আবার কেউ তা সিদ্ধ করে পিঠা কিংবা নানা সুস্বাদু খাবার তৈরি করে খাচ্ছেন। পাশাপাশি তালের বীজের শাঁসও অনেকের কাছে বেশ প্রিয়।
দুই-তিন মাস আগে বাজারে কাঁচা তালের রসালো শাঁস রসনাতৃপ্তি দিয়েছে। এখন শহর-গ্রাম সবখানেই তালের রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের পিঠা, পায়েস, পাকোয়ান, তালমিছরি, তালমাখনা, তালের বড়াসহ রকমারি খাবার। ভাদ্রের বাতাসে মিশে আছে পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ।
গ্রামবাংলার অতি পরিচিত মৌসুমি ফল তাল এখন শহর ও গ্রামের হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে। বাজারে তাল দেখলেই অনেকের মনে পড়ে যায় শৈশবের দিনগুলোর কথা। পাকা তালের পিঠা-পুলি, তালের বড়া, পায়েস ও মিষ্টি রসের স্বাদ এখনো মানুষের মনে জায়গা করে আছে।
দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই কমবেশি তালগাছ দেখা যায়। সমতল, পাহাড় কিংবা হাওর-বাঁওড়—সব জায়গাতেই তালগাছের দেখা মেলে। কবিতার সেই পঙ্ক্তির মতো—‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে।’ একসময়, ১৫-২০ বছর আগেও, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারি সারি তালগাছ চোখে পড়ত। তবে কালের আবর্তে তালগাছের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।
বৃক্ষরোপণ অভিযান চললেও অন্যান্য গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে তালগাছ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। অপরিকল্পিতভাবে তালগাছ কাটা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন আর মাঠের ধারে কিংবা গ্রামীণ পথের পাশে আগের মতো সারি সারি তালগাছ দেখা যায় না। হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছে বাবুই পাখির বাসা বাঁধার সেই মনকাড়া দৃশ্যও।
সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এলেও তালের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে পাকা তাল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। বাজারে রয়েছে তালের ভালো চাহিদা। স্থানীয় বাজারগুলোতে আকারভেদে প্রতি পিস পাকা তাল প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তালের পাশাপাশি মৌসুমে তালের শাঁসও ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
তাল বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, আগে গ্রামের রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির উঠানে সহজেই তাল পাওয়া যেত। এখন তালগাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো তাল পাওয়া যায় না। ফলে বাজারে তালের দামও বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তাল বিক্রি করে মৌসুমি আয় করছেন অনেক ছোট ব্যবসায়ী।
ক্রেতাদের অনেকেই বলেন, তাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও শৈশবের স্মৃতি। পাকা তাল দিয়ে তৈরি তালের বড়া, পিঠা, পায়েসসহ বিভিন্ন খাবারের স্বাদ এখনো মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়।
তালগাছের ব্যবহারও বহুমুখী। তালপাতা দিয়ে হাতপাখা ছাড়াও টুপি, ঝুড়ি, চাটাই, মাদুর, বেড়া ও বিভিন্ন খেলনা তৈরি করা হয়। তালগাছের কাঠও বেশ শক্ত ও আঁশযুক্ত। সহজে পচে বা নষ্ট হয় না। এ কাঠ দিয়ে ছোট ডিঙি নৌকা, ছাতার বাঁট, লাঠি, বাক্স, পাপোশ, কোয়ারসহ নানা ধরনের জিনিস তৈরি করা যায়।
তবে তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী ফলের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তালগাছ শুধু ফলই দেয় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তালগাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন করে তালবীজ ও চারা রোপণের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/জেআ