ইতিহাসের সাক্ষী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি

যান্ত্রিক সভ্যতার দ্রুত গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বদলে গেছে তিলোত্তমা ঢাকা। চার লেনের পিচঢালা পথ, ফ্লাইওভার আর মাথার ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলা মেট্রোরেলের এই যুগে এসে রাজধানীর বুকে আদিম কোনো যানবাহনের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু সব আধুনিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢাকার রাজপথে আজও সগৌরবে টিকে আছে মুঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী এক যান—ঘোড়ার গাড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘টমটম’ নামেই বেশি পরিচিত।
পুরান ঢাকার জ্যামজট আর যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে যখন টমটমের খুরের ‘খট খট’ শব্দ কানে আসে, তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও মন হারিয়ে যায় শত বছর পেছনের কোনো এক রূপকথার গল্পে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খতিয়ান:
ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস প্রায় দুশো বছরের পুরোনো। ১৮৩০ সালের দিকে ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে আরমানিটোলার বাসিন্দা সিরকো নামক এক আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ঢাকার রাস্তায় প্রথম ভাড়ায় চালিত ঘোড়ার গাড়ি নামান, যা তখন ‘সিরকো টমটম’ নামে পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে ঢাকার নবাব ও উচ্চবিত্ত পরিবারের যাতায়াত এবং রাজকীয় আভিজাত্যের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে এই বাহন। তবে কালের বিবর্তনে মোটরচালিত গাড়ির দাপটে এই রাজকীয় যানটি আজ কেবলই এক টুকরো টিকে থাকা ইতিহাস।
রুট ও বর্তমান ব্যস্ততা:
পুরো ঢাকায় এখন আর ঘোড়ার গাড়ির দেখা মেলে না। এর অস্তিত্ব মূলত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরান ঢাকার সুনির্দিষ্ট একটি রুটে। প্রতিদিন গুলিস্তান (গোলাপশাহ মাজার) থেকে শুরু করে নর্থসাউথ রোড হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত এই টমটমগুলো যাত্রী নিয়ে নিয়মিত চলাচল করে।
- ভাড়া ও যাত্রী: সদরঘাটগামী লঞ্চের যাত্রী এবং পুরান ঢাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই মূলত এর নিয়মিত আরোহী। তবে ছুটির দিনগুলোতে ঢাকার দূর-দূরান্ত থেকে আসা সৌখিন মানুষ ও দর্শনার্থীরা স্রেফ ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে এবং আনন্দ ভ্রমণের জন্য এই গাড়িতে চড়েন।
- বিশেষ আয়োজন: বিয়ে-শাদি, সুন্নতে খতনা, রাজনৈতিক বা সামাজিক শোভাযাত্রা এবং সিনেমার শুটিংয়ের মতো বিশেষ দিনগুলোতে এই ঘোড়ার গাড়িগুলোর চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী। তখন এই গাড়িগুলোকে রঙিন কাপড়, ফুল ও ঝালর দিয়ে রাজকীয় সাজে সাজানো হয়।
টিকে থাকার লড়াই ও সংকট:
ঐতিহ্যের এই বাহনটি টিকিয়ে রাখা এখনকার দিনে বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। গাড়িচালকরা জানান, ঢাকার তীব্র যানজট, ঘোড়ার খাদ্য সামগ্রীর (ছোলা, ভুসি, খড়) চড়া দাম এবং ঘোড়া রাখার নির্দিষ্ট আস্তাবলের অভাবের কারণে এই ব্যবসা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তা সত্ত্বেও বংশপরম্পরায় কিছু মানুষ আজও ভালোবেসে এবং জীবিকার তাগিদে এই পেশাটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
ঘোড়ার গাড়ি কেবল একটি সাধারণ যানবাহন নয়, এটি ঢাকার আদি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। বিশ্বের বহু দেশে তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাহনগুলোকে পর্যটনের স্বার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে টিকিয়ে রাখা হয়। আমাদের ঢাকা শহরের এই ঐতিহ্যবাহী ‘টমটম’ বা ঘোড়ার গাড়িগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর পরিচয় তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/জেআ