এক নীল হীরার চুরি, তিন দশক ধরে সৌদি-থাইল্যান্ড সম্পর্কে সংকট

সৌদি আরবের রাজপরিবারের প্রাসাদ থেকে দুর্লভ একটি নীল হীরা চুরির ঘটনা জন্ম দিয়েছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকটের। এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চুরি করা অলংকার উদ্ধারের তদন্তে উঠে আসে দুর্নীতির অভিযোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তিন সৌদি কূটনীতিকের হত্যাকাণ্ড ও এক ব্যবসায়ীর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও থাইল্যান্ডের সম্পর্ক তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। ‘ব্লু ডায়মন্ড অ্যাফেয়ার’ নামে পরিচিত এ ঘটনা আধুনিক ইতিহাসের আলোচিত কূটনৈতিক বিরোধগুলোর একটি।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৯ সালে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের রাজপরিবারের একটি প্রাসাদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন থাইল্যান্ডের এক নাগরিক। সুযোগ বুঝে তিনি প্রাসাদ থেকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান অলংকার চুরি করেন। চুরি হওয়া গয়নার মধ্যে ছিল ৫০ ক্যারেটের একটি দুর্লভ নীল হীরা।
চুরি করা অলংকারের পরিমাণ ছিল বিপুল। সেগুলো ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যাগে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সেবা ডিএইচএলের মাধ্যমে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন ওই কর্মী।
চুরির বিষয়টি জানাজানি হলে সৌদি আরব গয়নাগুলো ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়। থাই পুলিশ দাবি করে, তারা চুরি হওয়া অলংকার উদ্ধার করেছে। কিন্তু সৌদি আরবে ফেরত পাঠানো গয়না পরীক্ষা করে দেখা যায়, সবচেয়ে মূল্যবান কিছু অলংকার নেই। কয়েকটি আসল গয়নার পরিবর্তে নকল অলংকারও পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই সঙ্গে নিখোঁজ থেকে যায় বহুল আলোচিত নীল হীরাটি।
তদন্ত ঘিরে হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনা
গয়না উদ্ধারের ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি। বরং তদন্তের সূত্র ধরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একই রাতে তিন সৌদি কূটনীতিককে হত্যা করা হয়। পরে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে আরও কয়েকটি ঘটনার বিষয়ে। একই সময়ে সৌদি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আল-রুয়াইলি থাইল্যান্ডে নিখোঁজ হন। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও দীর্ঘদিন ধরে রহস্যাবৃত থেকে যায়।
সৌদি আরবের অভিযোগ ছিল, চুরি হওয়া অলংকার ফেরত দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্তে থাইল্যান্ড কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে, ঘটনাগুলোর বিচার ও তদন্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলতে থাকে।
কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও থাইল্যান্ডের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং থাইল্যান্ড থেকে কর্মী নিয়োগ ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর প্রভাব পড়ে দুই দেশের বাণিজ্য, শ্রমবাজার ও পর্যটন খাতেও। বিশেষ করে সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় বহু থাই নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
একটি চুরির ঘটনা থেকে শুরু হওয়া বিরোধ ক্রমে দুর্নীতি, অপরাধ তদন্ত ও কূটনৈতিক আস্থার সংকটে রূপ নেয়। আর সেই সংকটের কেন্দ্রে থাকা নীল হীরাটির সন্ধান না মেলায় রহস্য আরও গভীর হয়।
২০২২ সালে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরব ও থাইল্যান্ড পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের ফলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও শ্রমবাজারে সহযোগিতা বাড়ানোর পথ খুলে যায়।
তবে ‘ব্লু ডায়মন্ড অ্যাফেয়ার’-এর সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটির উত্তর আজও মেলেনি—৫০ ক্যারেটের সেই দুর্লভ নীল হীরাটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল? বহু বছর পেরিয়ে গেলেও হীরাটির অবস্থান এবং চুরি হওয়া অলংকারের পুরো রহস্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ভোরের আকাশ/জেআ