কেন মেঘগুলো এত নরম ও তুলোর মতো দেখায়?

শরতের সুনীল আকাশ হোক কিংবা রোদঝলমলে চৈত্র-বৈশাখ—মাথার ওপর শুভ্র তুলোর মতো ভেসে থাকা মেঘের ভেলা মন ভালো করে দেয় না এমন মানুষ মেলা ভার। দেখতে একেবারে তুলতুলে হালকা মনে হলেও বিজ্ঞান বলছে, বিশাল আকাশের বুকে ভেসে থাকা এই তুলোর মতো একেকটি মেঘের ওজন নাকি প্রায় কয়েক লাখ কেজি বা শত শত হাতির ওজনের সমান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, টন কে টন ওজনের এই প্রকাণ্ড পানির পিণ্ডগুলো মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাখির পালকের মতো ভেসে বেড়ায়? আকাশে এই পেঁজা তুলোর ভাসমান যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর পদার্থবিদ্যা।
১. দেখতে তুলো হলেও আসলে এরা কী?
আমরা আকাশে যে ধবধবে সাদা তুলোর মতো মেঘ দেখতে পাই, বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘কিউমুলাস’ মেঘ। এগুলো কোনো বাস্তব তুলো বা বাষ্পের ফাঁপা বেলুন নয়।
পৃথিবীপৃষ্ঠের নদী-নালা, খাল-বিল ও সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে উত্তপ্ত হয়ে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। এই হালকা জলীয় বাষ্প যখন ওপরে ওঠে, তখন বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের ঠাণ্ডা স্পর্শে তা ঘনীভূত হয়ে কোটি কোটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পানির ফোঁটা এবং বরফকণায় রূপ নেয়। যখন এই ফোঁটাগুলো কাছাকাছি এসে জমাট বাঁধে, তখনই তৈরি হয় আমাদের পরিচিত এই সাদা মেঘ।
২. লাখ কেজির মেঘ কীভাবে ভেসে থাকে?
বিজ্ঞানীদের মতে, মাঝারি আকৃতির একটি ‘কিউমুলাস’ মেঘের ওজন প্রায় ৫ লক্ষ কেজি (বা ৫০০ টন) পর্যন্ত হতে পারে—যা প্রায় ১০০টি পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজনের সমান! তাহলে বিশাল এই ওজন নিচে খসে পড়ে না কেন? এর পেছনে মূল কারণ ৩টি:
মাইক্রোস্কোপিক ক্ষুদ্রতা: মেঘের ভেতরের পানির ফোঁটাগুলো এতই ছোট (একটি ফোঁটার ব্যাস মানুষের চুলের চেয়েও প্রায় ১০০ গুণ ছোট) যে এদের একক কোনো ভারী অস্তিত্ব তৈরি হয় না।
বায়ুর উর্ধ্বমুখী চাপ : সূর্য যখন পৃথিবীর মাটিকে উত্তপ্ত করে, তখন মাটির সংস্পর্শে থাকা বাতাস গরম হয়ে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এই ওপরের দিকে উঠে যাওয়া গরম বাতাস বা ‘আপড্রাফট’ নিচের দিক থেকে ভেসে থাকা মেঘের ক্ষুদ্র পানির ফোঁটাগুলোকে অনবরত ঠেলতে থাকে। ফলে তারা নিচে পড়ার সুযোগ পায় না।
বিশাল আয়তনে ছড়িয়ে থাকা: পাঁচ লাখ কেজি ওজন একটি ছোট জায়গায় পুঞ্জীভূত থাকে না। এটি মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে অতি সূক্ষ্ম কণা হিসেবে ছড়িয়ে থাকে। ফলে প্রতি ঘনমিটারে এর ঘনত্ব বা ওজনের প্রভাব বাতাসের চেয়েও কম মনে হয়।
৩. সাদা তুলো কখন কালচে বা ধূসর হয়?
আকাশে ভেসে থাকার সময় মেঘগুলো যখন সূর্যরশ্মির সম্পূর্ণ আলো প্রতিফলিত করে দেয়, তখন আমরা নিচে থেকে এদের তুলোর মতো ধবধবে সাদা দেখি।
কিন্তু মেঘ যখন আরও বেশি ঘন হয় এবং ভেতরের পানির ফোঁটাগুলো আকারে বড় হতে থাকে, তখন সূর্যের আলো আর সেই মেঘ ভেদ করে নিচে আসতে পারে না। ফলে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে সেই মেঘকেই কালো বা কালচে ধূসর দেখায়—যা বৃষ্টির আগমনী বার্তা দেয়।
আকাশে ভেসে থাকা তুলোর মতো মেঘ কেবল কবিদের কল্পনার অনুষঙ্গ নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক অপূর্ব বৈজ্ঞানিক প্রকৌশল। মাধ্যাকর্ষণ আর বায়ুর তাপমাত্রার এই সুক্ষ্ম খেলা না থাকলে হয়তো বৃষ্টি কিংবা আবহাওয়া চক্রের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে যেত।
ভোরের আকাশ/জেআ