খেলা নিয়ে প্রাণহানি রোধের উপায় কী?

আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নিয়ে আমাদের মাতামাতি নতুন কিছু নয়। ক্রিকেটের মাঠে ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। তখন মনে হয়, এ দেশের মানুষ কেউ না। এক পক্ষ ভারত আর আরেক পক্ষ পাকিস্তানের হয়ে গর্জে উঠে। একই অবস্থা বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়েও। হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মেতেছিলাম আমরা। শিশু থেকে বৃদ্ধÑসবাই যেন উত্তেজনায় কাঁপছিল। আর তরুণদের অবস্থা? তারা তো একেকজন ফুটবল বিশেষজ্ঞ। লিওনেল মেসি, নেইমারের মতো খেলোয়াড়েরও তারা ভুল ধরতে দ্বিধা করছেন না। এছাড়া রেফারির চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করা তো কোনো ব্যাপারই না। এই পর্যন্ত না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু বাড়াবাড়ির এখানেই শেষ নয়। মোড়ে মোড়ে রঙিন পতাকা, চায়ের দোকানে উত্তপ্ত তর্ক এবং মারামারিও আছে। পতাকা টাঙানো থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু এবং খুনের মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে। বাড়ি ঘরে হামলার খবরও নতুন নয়।
গত দেড় মাসে দেশজুড়ে অন্তত ১৩ থেকে ১৪ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। একদিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, অন্যদিকে আছে ইচ্ছাকৃত সহিংসতা। এই দুটিকে আলাদা করে না দেখলে প্রকৃত সমস্যা বুঝা মুশকিল।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে আমগাছে উঠে ব্রাজিলের পতাকা লাগাতে গিয়ে প্রাণ হারায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাহিন শেখ। মানিকগঞ্জে একই কারণে মারা যান তরুণ ফয়সাল হোসেন, চট্টগ্রামে রামহরি বৈষ্ণব, টাঙ্গাইলে ছাদ থেকে পড়ে রায়হান মিয়া। এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি নামÑ নেত্রকোনার দীপ্ত চৌধুরী। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের পর শহরের শহীদ মিনার মোড় এলাকায় বিজয় মিছিলের ভিডিও ধারণ করতে একটি ভবনের ছাদে উঠেছিলেন তিনি, সেখানেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে মারা যান। নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় খেলা দেখে বাড়িতে দেরি করে ফেরা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সোমবার ভোরে কেশারপাড় গ্রামের মাইজ্জা মিয়ার নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে সেনবাগ থানার ওসি আবদুর রহিম সরকার জানিয়েছেন।
মৃত আলাউদ্দিন রায়হান (২৭) ওই বাড়ির কুয়েতপ্রবাসী আব্দুল বারেকের ছেলে। অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাঙ্গাসী ইউনিয়নের কালিঞ্জা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ২৬ বছর বয়সী ইলিয়াস খান ওই গ্রামের সাত্তার খানের ছেলে। তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়রা বলছে, বিকালে এলাকার মাঠে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কয়েকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এ নিয়ে স্থানীয় সিয়াম আহমেদের বাবা রাসেলের সঙ্গে তার নিকট আত্মীয় ইলিয়াস খানের তর্ক-বিতর্ক হয়। স্থানীয়রা তখন বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করলেও রাতে একই বিষয়কে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রাসেলের ছেলে সিয়াম ধারালো ছুরি দিয়ে ইলিয়াসের বুকে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। পুলিশ আজিজ নামে একজনকে আটক করেছে।
খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানো বা চিৎকার করা কিংবা ম্যাচ নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটির জের ধরে রাজনৈতিক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা; আপন চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন যুবক। ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা কিংবা এক কিশোরকে মেরে বালুচাপা দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। পতাকা টানানো বা খেলা দেখা নিয়ে তুচ্ছ তর্কে মাথা ফাটানো থেকে শুরু করে এবার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দেশীয় সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের খবরও সামনে এসেছে, যেখানে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক চিহ্নিত করেই তার ঘরে চড়াও হওয়া হয়েছে। এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই ধরনের সহিংসতায় দেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল। আবদুল মতিন নামে একজন বিদ্যুৎ স্পর্শে হারিয়েছিলেন দুই হাত ও দুই পা।
বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যু অবশ্যই এড়ানো যেত। এ জন্য দরকার ছিল সচেতনতা। তবে বিদ্যুৎ কোম্পানির অসচেতনতাও সামনে চলে এসেছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে তারা প্রচারাভিযান চালাতে পারতো। এতে মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। হয়তো বেঁচে যেত কিছু প্রাণ। সংঘাতের বিষয়টি নিয়ে কেবল দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কী করার আছে? আমরা অতিমাত্রায় আবেগে ভাসছি। ভুলে যাচ্ছি হারজিতের কথা। খেলায় তো হারজিত থাকবেই। তাহলে হামলা-সংঘর্ষ কেন? এক্ষেত্রে কটূক্তির কথাটাই সামনে আসবে। কারণ প্রিয় দল নিয়ে যখন অন্য কেউ কটূক্তি করে, তখন অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এজন্য আমাদের সহনশীল হতে হবে। কাউকে কটূক্তি করা যাবে না। মনে রাখতে হবেÑহাজার মাইল দূরের খেলা নিয়ে ঘরে-এলাকায় অশান্তি করা যাবে না। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখতে হবে। অন্যথায় চরম মূল্য দিতে হবে
লেখক : সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/এনএস