৩৬ জুলাই ২০২৪
জুলাই কি এতো দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল?

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মাস ও সাল কেবল ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট সময় নয়, বরং জাতির স্মৃতিতে একেকটি প্রতীক হয়ে থাকবে অবিস্মরণীয়। যেমন ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর; রক্তাক্ত নয় মাস যুদ্ধের পর অর্জিত মহান স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই । শাসকগোষ্ঠীর ভুলের কারণেই মুক্তিকামী মানুষের রক্তে অর্জিত মাতৃভাষা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ে। আজকের আলোচ্য বিষয় জুলাই ২০২৪ ক্যালেন্ডারের হিসাবে ৩১ দিনের হলেও এই মাস যেন অনেকের কাছে ছিল অনন্ত দীর্ঘ—আশা, উদ্বেগ, প্রতিবাদ, সহিংসতা, শোক এবং অনিশ্চয়তার এক বেদনাময় অধ্যায়। যা ৩৬ জুলাই নামেই পরিচিত। আপনজন হারানোর এক রক্তাক্ত ও স্মরণীয় মাস। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—জুলাই কি সত্যিই এত দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল?
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুতই একটি বৃহত্তর জাতীয় সংকটে রূপ নেয়। প্রথম দিকে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ ও দাবি-ভিত্তিক। কোটা সংস্কারের সাধারণ দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন কীভাবে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিল, আর একটি দীর্ঘ দেড় দশকের 'ফ্যাসিস্ট' সরকারের ক্ষমতার মসনদ ভেঙে পড়লো—এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক: এই দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী পথ কি এড়ানো যেতো? কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়, সংঘর্ষ বাড়ে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
জাতিসংঘের একটি হিসাব অনুযায়ী এই আন্দোলনে আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, শেখ ফাহমিন, ওয়াসিম, হৃদয় চন্দ্র, রুদ্র সেনদের মতো প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ আহত হন। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি একদিনে ঘটেনি; বরং প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্র যখন সংলাপের বদলে বলপ্রয়োগ বেছে নিয়েছে, তখনই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
অনির্বাচিত ও সতেরো বছরের দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার তথা পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র-যুব সংগঠনগুলো একযোগে আন্দোলন দমনে নামে। দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়, ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়—যার ফলে কার্যত পুরো দেশ বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে প্রকাশিত একটি অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
এই দমন-পীড়ন আন্দোলনকে থামানোর বদলে আরও বিস্তৃত করে তোলে। যে আন্দোলন প্রথমে কেবল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, এমনকি সাধারণ পেশাজীবী ও নানা শ্রেণির মানুষের মধ্যেও। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি করে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রতিদিন মানুষ মারা যাওয়ার খবর আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে এবং একে একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করে। যে প্রশাসনিক সমস্যা একটি বৈঠকেই সমাধানযোগ্য ছিল, তা তখন রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতার প্রশ্নে পরিণত হয়ে যায়। ২১ জুলাই ২০২৪ আপিল বিভাগ কোটা পুনর্বিবেচনা করে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের নির্দেশ দেয়—যা মূল দাবির প্রায় পুরোটাই মেনে নেওয়ার শামিল। যদি এই সিদ্ধান্ত কয়েক সপ্তাহ আগে, সহিংসতা শুরুর আগেই নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আন্দোলন মূল দাবি পূরণের সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যেত। কিন্তু ততক্ষণে আন্দোলনের চরিত্র বদলে গেছে।
কোটা সংস্কারের দাবি তখন আর মূল প্রশ্ন ছিল না—প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিহতদের বিচার, দমন-পীড়নের জবাবদিহিতা এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তন। ৩ আগস্ট আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন যে বিচারের আগে আন্দোলন থামবে না, এবং এরপরই এক দফা দাবিতে রূপ নেয় গোটা আন্দোলন। ৪ আগস্ট, অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনেই প্রায় ৯১ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও ছিলেন। এই দিনটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি। পরদিন, ৫ আগস্ট, গণভবন অভিমুখী লংমার্চের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। যদিও গণভবন অভিমুখে লংমার্চের পূর্বঘোষিত তারিখ ছিল ৬ আগস্ট, তখনকার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং অপরাপর আন্দোলনকারী দল বা গোষ্ঠীগুলো একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট লংমার্চের কর্মসূচি পালন করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করে। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়, পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনার দিকে এগোয়, তখন সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জুলাই ২০২৪ সেই বাস্তবতারই একটি কঠিন উদাহরণ।
এই দীর্ঘ সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁদের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। বহু পরিবার উদ্বেগে দিন কাটিয়েছে। হারিয়েছে সন্তান, ভাই, স্বামী ও বাবা । অভিভাবকেরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি জাতির জন্য তরুণদের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সেই সম্পদের ক্ষয় কখনোই কাম্য হতে পারে না।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও জুলাই ছিল ব্যয়বহুল। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েন এবং ডিজিটাল অর্থনীতিও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ইন্টারনেট-নির্ভর ফ্রিল্যান্সার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অনলাইন ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখোমুখি হয়। একটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত দেশের জন্য এ ধরনের দীর্ঘ অচলাবস্থা কেবল তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সৃষ্টি করেছে।
জুলাই আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—সংকট যত দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, ততই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মঙ্গলজনক। মতভেদ যদি আলোচনার টেবিলে সমাধান না হয়ে রাজপথে সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়। সরকার, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের দায়িত্ব হলো উত্তেজনা নয়, সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
এটিও মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব, বট আইডির মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উসকানিমূলক প্রচারণা একটি সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং সচেতন নাগরিক আচরণ আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজন।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার আইন প্রয়োগের সক্ষমতায় নয়; বরং নাগরিকদের আস্থা অর্জনের ক্ষমতায়ও নিহিত। আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। ভবিষ্যতে যেন কোনো দাবি বা সংকট এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে না পৌঁছায়, সে জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংলাপের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি বড় সংকট একটি শিক্ষা রেখে যায়। সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে সংকটের মূল্য কিছুটা হলেও সার্থক হয়। কিন্তু যদি একই ভুল বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে ইতিহাস কেবল বেদনার পুনরাবৃত্তিই ঘটায়। জুলাই ২০২৪ আমাদের সামনে এমনই এক প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেব, নাকি ভবিষ্যতের জন্য আরও একটি দীর্ঘ জুলাইয়ের অপেক্ষা করব?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বড় ধরনের প্রাণহানি বা জাতীয় সংকটের পর স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন। কোথায় সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতা ছিল, কোথায় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ হয়েছে, কোথায় উসকানি বা সহিংসতার দায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর না মিললে সমাজে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস থেকে যায়। দায় নির্ধারণ প্রতিশোধের জন্য নয়; ভবিষ্যতে একই ভুল এড়ানোর জন্য।
এই ইতিহাস থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জনগণের ন্যায্য দাবিকে অবজ্ঞা করে দমনের পথে হাঁটলে তা কখনো সমাধান বয়ে আনে না, বরং সংকটকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। জুলাই দীর্ঘ হয়েছিল কারণ প্রতিটি সংকটমুহূর্তে রাষ্ট্র জনগণের কণ্ঠস্বরকে শোনার বদলে তা স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছে। এই শিক্ষা শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—ভবিষ্যতের যেকোনো ক্ষমতাকাঠামোর জন্যই এটি একটি সতর্কবার্তা।
জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি পরীক্ষার সময় ছিল। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সংকটের অংশ হয়ে উঠেছিল। ফলে ভবিষ্যতে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সক্ষমতা ও সমন্বয় নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক
ভোরের আকাশ/এনএস