ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স
কথিত সাংবাদিকের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার পথ কী নেই?

জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিদিন কতজন সাংবাদিক যান? এই প্রশ্নের উত্তর সবারই অজানা। কারণ কতজন সাংবাদিক সেখানে যান, তার তালিকা থাকে না। তবে অনুমান করা যায় একশ থেকে দেড়শ জন সাংবাদিক প্রতিদিন প্রেস ক্লাবে যান। কিছু সাংবাদিক যাদের অফিস পল্টন বা এর আশপাশে তারাই সাধারণত সেখানে নিয়মিত যান। এর বাইরে খুব একটা বেশি সাংবাদিক প্রেস ক্লাবে যেতে পারেন না কাজের স্বার্থেই। তারা প্রেস ক্লাবে যান কালেভদ্রে কিংবা বিশেষ অকেশনে। এর বাইরে সেখানে তাদের যাওয়ার সুযোগ মেলে না।
প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ‘সাংবাদিকের’ দেখা মেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে। কিন্তু এত সাংবাদিকের সেখানে কাজ কী? তারা কী নিয়মিত নিউজ লেখেন? এক বাক্যে বলা যায়, না। কারণ তারা যদি নিয়মিত নিউজ লিখতেন তাহলে অবশ্যই পত্র-পত্রিকা কিংবা নিউজ পোর্টালে তাদের নিউজ থাকতো। কিন্তু নেই। তার মানে তারা নিয়মিত নিউজ লেখেন না। তাহলে সেখানে যান কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানতে হবে কারা সেখানে যান।
কিছুদিন আগে আমার পরিচিত একজন কর্মকর্তা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে তার কার্যালয়ে চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সমস্যার বিষয়ে আলাপ চলাকালে তার অফিস নিয়েও আলোচনা হলো। আলাপ-চারিতার এক পর্যায়ে তিনি কয়েকজন সাংবাদিকের নাম বললেন। আমি তাদের চিনি কিনা সেটা জানতে চাইলেন। বিনয়ের সঙ্গে তাকে বললাম আমি একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী। এই লোকগুলোকে আমি চিনি না। পরে দেখলাম ওই লোকগুলোর মধ্যে একজন আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। তার কয়েকটা লেখা আমি ফেসবুকে পড়েছি। বলতে হবে তার লেখার হাত ভালো। কিন্তু তার কোনো নিউজ ফেসবুকে পেলাম না। মজার ব্যাপার হলো আমন্ত্রণকারী আমাকে গোটা বিশেক ভিজিটিং কার্ড দেখালেন। এগুলোর মধ্যে কয়েকটা পত্রিকার নাম আমি জানি; কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে ওই পত্রিকাগুলোর ছাপা কপি আমি কখনো দেখিনি। বাকি পত্রিকাগুলোর নাম আমি প্রথম শুনলাম। আমার জানা বা না জানাটা সমস্যা না। সমস্যা হলো ভিজিটিং কার্ডে ফোন নম্বরের পাশে বিকাশ/নগদ লেখা রয়েছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে ফোন নম্বরের পাশে বিকাশ/নগদ কেন লিখতে হবে? নাম সর্বস্ব নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকের ভিজিটিং কার্ডও দেখলাম। এছাড়া কিছু বøগারও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দিব্যি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স দাপিয়ে বেড়ান। তাদের কদরও বেশ ভালো। এসব পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও ব্লগার সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা মানছেন না। তারা মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করছেন। অনেকের বিরুদ্ধে ‘বø্যাক মেইল’ করারও অভিযোগ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ভিডিও ও ছবি তৈরি করে সংবাদ পরিবেশনেরও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বড় ব্যাপার হলোÑএই অফিসে নিউজ করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। সেটা ওই ‘সাংবাদিক’রা করছেন না। হয়তো করার সক্ষমতাও তাদের নেই। তাদের উপদ্রবে রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের বেশিরভাগ লোকজন অতিষ্ঠ। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করা হয়ে থাকে। তবুও ‘মধু’র আশায় সেখানে তারা দাপিয়ে বেড়ান।
এবার আসি ওই কথিত সাংবাদিকরা কেন ভুয়া তথ্য পরিবেশন করছেন? এর পেছনে রয়েছেন ওই অফিসেরই কিছু লোক। তারা মূলত দুর্নীতিবাজ। তারা নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে অন্যদের চরিত্র হননে ব্যস্ত। ওই সাংবাদিকদের কিছু আর্থিক সুবিধা তারা দিয়ে থাকেন। আর তাদের লেলিয়ে দেন অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তারাও জেনে বা না জেনে মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করছেন। এতে তিনি নিজে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি মূল ধারার সাংবাদিকদেরও হেয় করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত লোকটি হয়তো ভাবছেন সাংবাদিকতা বোধ হয় এমনই। কিছু টাকা দিলেই আরেকজনের চরিত্র হনন করানো যায়।
রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তারা দুর্নীতির মাধ্যমে যে টাকা আয় করে থাকেন, তার একটা অংশ ‘সাংবাদিকদের ম্যানেজ’ করার জন্য রাখা হয়। সেখান থেকে কোনো কোনো সাংবাদিক মাসোহারা পেয়ে থাকেন। অনেকে আবার সাপ্তাহিক হিসেবে টাকা নেন। সাংবাদিকদের এই বখরা নির্ধারণ হয় পত্রিকা বা টেলিভিশনের অবস্থান ভেদে। অনেকে সপ্তাহে দুইশ টাকাও পান। কে টাকা পেল আর কে পেল না তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। এই লেখার উপজীব্যও সেটা না। একজন টাকা দেবেন; আরেকজন নেবেন এটা নিতান্তই তাদের বিষয়। আমার আপত্তি হলো সংবাদের মান নিয়ে। একজন অভিযোগ করলেই যাচাই-বাছাই না করে কারো বিরুদ্ধে একজন সাংবাদিক সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন কিনা? উপদাহরণ হিসেবে একটা ঘটনা বলি। এক লোক ফি বাবদ এক কর্মকর্তাকে কিছু টাকা দিয়েছেন। এটা ভিডিও করে রেখেছেন আরেকজন। পরে এক কথিত সাংবাদিক সেই ভিডিওর বলে একটা সংবাদ পরিবেশন করেছেন। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তার বক্তব্য নেওয়া হয়নি। এটা সাংবাদিকতার জন্য মারাত্মক। পরে টাকা দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেছেন, তিনি ফি বাবদ টাকা দিয়েছেন। এর চেয়ে বেশি টাকা তিনি দেননি। সেটারও ভিডিও আছে। অথচ সেটা সংবাদে আসেনি। ওই সংবাদের ফলে একজন নির্দোষ লোক, কিন্তু দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল সমাজে। এটাকে কোনোভাবেই সাংবাদিকতা বলা যায় না। এই অপসাংবাদিকতা রোধে সম্পাদকদের ভ‚মিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদের যেসব উপাদান দরকার, তা না থাকলে সংবাদ প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে কারো চরিত্র হনন করা ভালো কিছু বয়ে আনে না।
এমনিতেই সাংবাদিকতা নানা সংকটে আবর্তিত; তার উপর যদি হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়, তাহলে পেশাটাও ঝুঁকিতে পড়বে। মনে রাখতে হবেÑনগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। আশা করি, সম্পাদকরা বিষয়টা ভেবে দেখবেন। অন্যথায় একটা সময় আপনাদের পস্তাতে হবে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ভোরের আকাশ
ভোরের আকাশ/এনউব