জলাবদ্ধ ঢাকা: দায় এড়াতে পারে না সরকারও, নাগরিকরাও

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম ভোগান্তির নগরী বলা হয়। বর্ষা মৌসুম এলেই সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়, যান চলাচল ব্যাহত হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির থাকে নগরজীবন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনবহুল মহানগর ঢাকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটির বেশি মানুষের বসবাস। এত বিপুল জনসংখ্যার চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় প্রতি বর্ষাতেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না, এখন মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে বর্তমানে ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। রাজধানীর খালগুলোর বড় অংশ দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে যাওয়ার স্বাভাবিক পথও অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
জলাবদ্ধতার জন্য সরকারের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার রক্ষা করতে ব্যর্থতা, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এক সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করে, আরেক সংস্থা পরে সেটি খুঁড়ে ফেলে। কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়, কোথাও পাইপলাইন বসে, আবার কোথাও বছরের পর বছর উন্নয়নকাজ অসমাপ্ত পড়ে থাকে। এসব কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভোগান্তি বাড়ে।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। জলাবদ্ধতার জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি উঠে আসে না। নাগরিকদের অসচেতন আচরণও এ সংকটকে ভয়াবহ করে তুলছে। রাজধানীতে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় ড্রেন, নালা ও খালে জমে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অনেক ড্রেনে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী এসব প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য।
ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি নামতে পারে না। আগে কয়েক ঘণ্টায় যে পানি নেমে যেত, এখন অনেক এলাকায় ৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত জমে থাকে। নিষিদ্ধ হওয়ার পরও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। আইন প্রয়োগ দুর্বল, আবার নাগরিকদের আইন মানার প্রবণতাও আশানুরূপ নয়।
এখানেই প্রশ্ন আসে—নাগরিক অসচেতনতার দায় কি শুধু জনগণের? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোরও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ এই সংকটের দায় একপক্ষের নয়; সরকার ও নাগরিক—উভয়েরই।
জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও বিশাল। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যানজট বাড়ে এবং ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ ও ডেঙ্গুর মতো রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই এটি শুধু অবকাঠামোগত নয়, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিরও বড় চ্যালেঞ্জ।
সমাধানের জন্য প্রথমেই খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু বাস্তবতা বিবেচনায় অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তনও অপরিহার্য। ড্রেনে বা খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
প্রযুক্তিও হতে পারে কার্যকর সমাধানের অংশ। যেমন ঢাকায় ট্রাফিক আইন প্রয়োগে এআইভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি প্রকাশ্যে ড্রেন বা খালে বর্জ্য ফেলা শনাক্তেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্ত করে জরিমানা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধও বাড়বে।
বিশ্বের সিঙ্গাপুর, টোকিও কিংবা নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন শহর পরিকল্পিত ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ ব্যবস্থা ও কঠোর নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ঢাকা চাইলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত ফল। তাই সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত। দোষারোপের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ। রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে কার্যকর উদ্যোগই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।
ভোরের আকাশ/জেআ