উৎকণ্ঠা অপেক্ষা, দেশব্যাপী দোয়া
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় সারাদেশে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজের পর দেশের সব মসজিদে বিএনপির উদ্যোগে এ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এর অংশ হিসেবে নয়াপল্টনের মসজিদে আয়োজিত দোয়ায় অংশ নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশু আরোগ্য কামনায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে।
এর আগে কাতার থেকে একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর কথা ছিলো। তবে শেষ মুহূর্তে তা সম্ভব না হওয়ায় এখন জার্মানভিত্তিক প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হবে। কূটনৈতিক সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে।
জার্মান প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানি এফএআই রেন্ট-এ জেট জিএমবিএইচ এর সিএল৬০ (বোম্বার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার ৬০০ সিরিজ) জেট খালেদা জিয়াকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসি হয়ে সরাসরি লন্ডন যাবে। আজ বেলা ৩টা ২০ মিনিটে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে কাতার সরকারের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ‘এয়ারবাস ৩১৯’এ করে লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
কাতারের আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স না পৌঁছানোয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পিছিয়ে গেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স শুক্রবার আসছে না। সব ঠিক থাকলে সেটা শনিবার পৌঁছাতে পারে। ‘ম্যাডামের শরীর যদি যাত্রার উপযুক্ত থাকে এবং মেডিকেল বোর্ড যদি সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ ৭ তারিখ (রোববার) ফ্লাই করবেন।’
এদিকে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যেতে ঢাকায় আসেন তার পুত্রবধূ জোবাইদা রহমান। গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে ঢাকার বসুন্ধরার এ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সরকার তাকে ‘রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করায় পুরো এভারকেয়ার হাসপাতালজুড়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালের প্রবেশপথে সড়ক আটকে ব্যারিকেড দিয়ে দায়িত্বপালন করছেন পুলিশ, বিজিবি ও এপিবিএন সদস্যরা। ৭৯ বছর বয়সি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। ২০২০ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি সরাসরি অংশ নেননি।
তবে চলতি বছরের শুরুতে লন্ডনে চিকিৎসা করিয়ে আসার পর তাকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি তিনটি আসনে ভোট করবেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেওয়া হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে।
সরকার তাকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা করার পর সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় এসএসএফ ও পিজিআর। তিন বাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মঙ্গলবার রাতে এভারকেয়ারে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে আসেন। এরপর বুধবার রাতে সেখানে যান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে এভারকেয়ার হাসপাতালের ১২ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারক করছিলেন। চীন ও যুক্তরাজ্য থেকেও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গত কয়েক দিনে দেশে আসেন চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করে শুক্রবার জুমার পর দেশের সকল মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিএনপির পক্ষ থেকেও শুক্রবার সব ধর্মের উপাসনালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনার কর্মসূচি দেওয়া হয়। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বৈঠকে বসে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড। যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে এভারকেয়ারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডা. জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে মেডিকেল বোর্ড। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেক দোয়া করেছেন, সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাদের এই দোয়া ইনশাআল্লাহ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সুস্থ করে তুলবে।’
একজন সাংবাদিক এসময় জানতে চান, খালেদা জিয়ার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না। জবাবে ডা. জাহিদ বলেন, ‘পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। আমরা আপনাদেরকে আগেও বলেছি, মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো অবস্থাতেই উনার পরিবার অথবা আমরা দল কোনো অবস্থাতেই কোনো চিন্তা করছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানিতে অনেক অনেক আশাবাদী। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, উনার নামের আগে আমরা সবাই আপসহীন বলি। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে উনি অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এবারও ইনশাআল্লাহ উনি আমাদের মাঝে ফেরত আসবেন, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেবের সভাপতিত্বে এবং ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্যের পরিচালনায় প্রার্থনা সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন মজুমদার, অ্যাড. সুব্রত চৌধুরী, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, সিদ্ধেশ্বরী সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি নিবাস চন্দ্র মাঝি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক ডা. মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়।
এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও, জয়ন্ত সেন দীপু, মিলন কান্তি দত্ত, অ্যাড. তাপস কুমার পাল, অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, শুভাশীষ বিশ্বাস সাধন, বিপ্লব দে, পরিমল কুমার ভৌমিক, গিরীধারী সাহা, দিলীপ ঘোষ প্রমুখ।
ভোরের আকাশ/এসএইচ