বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির বাকযুদ্ধের নেপথ্যে কি!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তীব্র বাকযুদ্ধ চলছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে বিশিষ্টজনরা। রাজনৈতিক দল তিনটিই একে অন্যের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগের ভাষায়’ কথা বলার অভিযোগ করছে, কাজেই বাকযুদ্ধ ও তিক্ততা বেড়েই চলেছে, যা রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি করেছে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক কালে বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সভা সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে শুধু সংবাদ মাধ্যমেই নয়, দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে বলছেন রাজনীতির সঙ্গে বিশিষ্টজনরা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আধিপত্যবাদী রাজনীতির পথে ‘নতুন খেলোয়াড়’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে এনসিপি। দলটির নেতারা মনে করে, জামায়াতে ইসলামী ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিভাজন, ঘৃণা ও সহিংসতার রাজনীতি উসকে দিচ্ছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার পরিবর্তে তারা পুরোনো সহিংস ও আধিপত্যবাদী রাজনীতির পথে ‘নতুন খেলোয়াড়’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাচ্ছে, যা দেশের জন্য অশুভ সংকেত।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের একটি বক্তব্যকে ‘অসত্য, মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে দলটির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। এতে বলা হয়, এনসিপি তা প্রত্যাখ্যান করছে এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এনসিপি মনে করে, জামায়াতের এ বিবৃতি বাস্তবতাবিবর্জিত, রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং জনমত বিভ্রান্ত করার স্পষ্ট অপচেষ্টা।
গত ৬ ডিসেম্বর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ন্যাশনাল প্রফেশনালস অ্যালায়েন্সের (এনপিএ) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার প্রমাণনির্ভর যে মন্তব্য করেন, তা সম্পূর্ণ তথ্যসম্মত ও দায়িত্বশীল। গত ২৭ নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদী থানায় নির্বাচনী প্রচারণাকেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলি চালানো তুষার মণ্ডল যে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী, তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে এবং অস্ত্র-গুলিসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। এমন স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা অস্বীকার করা সত্য গোপন ও দায় এড়ানোর নিন্দনীয় অপচেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এনসিপি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছে, সহিংসতা, অস্ত্রনির্ভরতা ও ধর্মের অপব্যবহার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থি। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। তাই জামায়াতে ইসলামিকে সত্য, শান্তি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এনসিপি। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের বক্তব্যকে অসত্য, মনগড়া ও উদ্দেশ্যমূলক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, ৬ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ‘অস্ত্রের রাজনীতি’ বা ‘অস্ত্রের মহড়া’ সংক্রান্ত যে অভিযোগ এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন করেছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জামায়াতে ইসলামী একটি দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল, যা দেশে আইনের শাসন, শান্তি, শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের ইতিহাস, আদর্শ ও রাজনৈতিক আচরণ কোথাও এমন অভিযোগকে সমর্থন করে না। তার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে শান্ত ও স্থিতিশীল রাখতে জামায়াত অত্যন্ত সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আসছে। দেশের জনগণ জানে-জামায়াত কখনোই সহিংসতা বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। অতএব, তার মতো একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক, অযৌক্তিক ও সস্তা রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
জুবায়ের বলেন, আমরা আশা করি, আখতার হোসেন তার ভিত্তিহীন বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। রাজনৈতিক বিভাজনকামী, উত্তেজনামূলক ও অসত্য প্রচারণা জাতির জন্য কোনো উপকার বয়ে আনে না। অসত্য বক্তব্য দিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। তিনি গণমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল ও দেশবাসীকে এ ধরনের মিথ্যাচার এবং অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেওয়ার পর ভার্চুয়াল এক বক্তব্যে তার পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের পরস্পরকে সমালোচনা করে দেওয়া বক্তব্যের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে উভয় দলের কর্মী ও সমর্থকদেরকেও। নিজ দলের প্রশংসা ও প্রতিপক্ষ দলকে ইঙ্গিত করে সমালোচনামূলক নানা পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। দল দুটির মধ্যে তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পাবনা, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, রাজশাহী ও নরসিংদীসহ দেশের কোনো কোনো জায়গায় তা সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। পরস্পরবিরোধী বাহাস কিংবা তিক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে, দুই দলের নেতারাই এ জন্য একে অন্যকে দায়ী করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, আমরা যা বলছি তা ইতিহাস ভিত্তিক ও সত্যি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলছেন, বিএনপির দিক থেকে কিছু আক্রমণাত্মক বক্তব্য আসছে যা অপ্রত্যাশিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দল দুইটির নেতাদের বক্তব্য শুনে তার মনে হয়েছে যে তারা উভয়েই একে অন্যকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। তার ধারণা, এটি চলতে থাকলে ভোটের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরেক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, মূলবিষয় হলো ভোট টানা এবং এক্ষেত্রে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু আর জামায়াত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ইস্যু সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি সিলেটে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের বিভাগীয় সমাবেশে জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান বলেন, একদল চাঁদাবাজির কারণে জনগণের ঘৃণা কুড়িয়েছে, আরেক দল আবার তার চেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে চাঁদাবাজিতে নেমে পড়েছে। একদল দখলদার বনতে গিয়ে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, আরেক দল বেপরোয়া দখলদার হয়ে উঠেছে। একদল জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, আরেক দল একই পথ ধরেছে, এমনকি নিজেদের মধ্যে মারামারিতে নিজেদের শেষ করে দিচ্ছে বলছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, শফিকুর রহমান আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ইঙ্গিত করে এই বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে এটি বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে রবিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভার্চুয়াল বক্তব্যে তারেক রহমান জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তাদেরকে তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে। ১৯৭১ সালে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে ঠিক যেভাবে পতিত স্বৈরাচার পালিয়ে যাবার আগে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছিল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে বিএনপিকে লক্ষ্য করে জামায়াত নেতারা বিভিন্ন সভা সমাবেশে দুর্নীতির বিষয়ে যেসব অভিযোগ করেছেন তারও জবাব দিয়েছেন তারেক রহমান। কেউ কেউ বলে থাকে পলাতক স্বৈরাচার বিএনপির সম্পর্কে যেভাবে মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতো, আমরা ইদানীং লক্ষ্য করছি কিছু কিছু ব্যক্তি বা দল ঠিক একই সুরে গান গাইছে বা একই সুরে কথা বলার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাদেরও তো দুজন ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে সেই সময় সরকারে ছিল উল্লেখ করেন তিনি।
সোমবারও এক অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, এখন দেশে এক ধরনের প্রচারণা চলছে- একজন বিশেষ কেউ ভালো, আর বাকি সবাই খারাপ এটা গণতন্ত্রের জন্য ডেঞ্জারাস ব্যাপার। এর আগে দলটি দুটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন।
গত ১১ই নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে এক বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জামায়াতের টিকিট কাটলেই কি কেউ বেহেশতে যেতে পারবে? যারা এসব মুনাফেকি করে, তাদের কাছ থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। এরপর ২০ নভেম্বর খুলনায় এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছিলেন, বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছে। তারা বর্তমানে মাহফিলে বাধা দেয়, মা-বোনদের তালিম প্রোগ্রামে বাধা দেয়। এটি করে তারা জামায়াতকে নয়, মূলত ইসলামকে বাধাগ্রস্ত করছে। এরপর বিএনপি নেতারা জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্ম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কড়া ভাষায় তার জবাব দিয়েছেন।
দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গত বুধবার ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগই ভালো ছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিরুদ্ধে ছিল, তারা এখন ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। এরপর শিবির নেতা ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের ঠাকুরগাঁওয়ে দেওয়া এক বক্তব্যেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিএনপি নেতাদের অনেকেই। সাদিক কায়েম তার বক্তব্যে বলেছিলেন, লন্ডন, দিল্লি, পিন্ডিতে বসে আর কোনো রাজনীতি চলবে না। নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি দেশেই হবে সিদ্ধান্ত। ধারাবাহিক এসব পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে মধ্যেই কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী ও সমর্থকরা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ