সমঝোতা সংকটে ১১ দল
আর মাত্র ৩৩ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার প্রতিযোগিতায় ভোটের মাঠে রয়েছে দুটি রাজনৈতিক জোট। একটি হলো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আর অন্যটি হলো জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে তেমন একটা সংকট পরিলক্ষিত না হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে রয়েছে জটিল সংকট। তবে সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনী আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে ১১ দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। শুরুতে আসন সমঝোতা নিয়ে ১১ দলীয় জোটের অসন্তোষ থাকলেও নানামুখী আলোচনার পর এখন তা কিছুটা নমনীয় হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে জোটের সঙ্গী একাধীক দলের নেতা জানিয়েছেন। নির্বাচনী মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোট অথবা আসন ভিত্তিক সমঝোতায় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পূর্বে সমঝোতা আসতে না পারায় জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেয়। পাশাপাশি এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তবে এনসিপির একটি আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়। কাজেই এনসিপির মনোনয়ন বৈধ হয় ৪৬টি। নির্বাচনী আসন সমঝোতায় প্রথমে ছিল আটটি রাজনৈতিক দল। পরে এই সমঝোতায় যুক্ত হয় এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে আট দলের আলোচনায় ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তোলে। অন্য দলগুলোর দাবিও ছিল তুলনামূলক বেশি। তবে শেষ মুহূর্তে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি যুক্ত হলে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের মধ্যে আসনসংখ্যা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। এনসিপির সূত্রে যে তথ্য পাওয়া গেছে, ১১-দলীয় নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপিকে ৩০টি আসনে জামায়াত ছাড় দেবে-এমন আলোচনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, এনসিপির ৪৪টি আসনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। তবে এনসিপি ৩৫ থেকে ৪০টি আসন চাইছে। তবে সেগুলোর বেশির ভাগ আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে এবি পার্টির সঙ্গে তিনটি আসনে সমঝোতা করতে চায় জামায়াত। তবে এবি পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে ৫৩টি আসনে। এ প্রসঙ্গে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আট দলের সঙ্গে এখনো এবি পার্টির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। শুধু জামায়াত নেতাদের সঙ্গে এবি পার্টি ও এনসিপির আলাদা বৈঠক হয়েছে। সমঝোতার আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে, এবি পার্টির মতে, আসন সমঝোতা এখনো স্পষ্ট নয়।বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক সূত্রে জানা গেছে, দলটির লক্ষ্য ২৫-৩০টি আসন। ইতোমধ্যে ১১টি আসন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত আসনে ছাড় না পেলে সমঝোতা না হওয়া অবশিষ্ট আসনে দলীয় প্রতীকে তাদের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন।এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সমঝোতার ধরন যা-ই হোক, নির্ধারিত কিছু আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অবশ্যই রিকশা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মামুনুল হক বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা গেছে। সমঝোতার আলোচনা তিন-চার দিনের মধ্যে একটা পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।এলডিপি সূত্রে জানা গেছে, ১১ দলীয় জোটে ২ আসনে সমঝোতা হলেও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবীক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ২৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আসন সমঝোতা নিয়ে এলডিপির তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ইসলামী আন্দোলনে অসন্তোষ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, জোটের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৫ টি আসন দেওয়ার কথা উঠেছে। তবে এতো কমসংখ্যক আসনে নিয়ে নির্বাচন করতে নাখোশ দলটির নেতাকর্মীরা। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭২টি আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে দলটি। দলটি জোটের ভেতরে আসন বণ্টন নিয়ে শক্ত অবস্থান থেকে দর কষাকষি করতে চায় কিংবা এককভাবে নির্বাচন করে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা আলাদাভাবে প্রমাণ করতে আগ্রহী।ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম দাবি করেন, তাদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সমঝোতা হচ্ছে না। ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এতে আগে যত আসনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পাশাপাশি কয়েকটি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় জামায়াতের তৃণমূলেও অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের দাবি, আসন নিয়ে কোনো দাবি নাই তাদের। তিনি বলেন, আমাদের কোনো দাবি নাই। আলোচনায় যৌক্তিকভাবে আমরা কিছু ক্রাইটেরিয়া ঠিক করছি। সেটার আলোকেই সমঝোতা সমন্বয় হবে। অন্যদিকে জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলন ৭০-৭৫টি আসন চাইছে, যেটি বাস্তবসম্মত নয়। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে কি না, সেটিও ভাবা দরকার। অতীতের নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করেও একই রকম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যারা ইসলামী দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে দেখতে চায় না, তারাই এসব ষড়যন্ত্র করছে। এছাড়া, খেলাফত মজলিস ২৫টিরও বেশি আসন চেয়েছিলো। কিন্তু তিনটি আসন নিয়েই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের। আর আসন সমঝোতায় পিছিয়ে নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন মাত্র দুইটি করে আসন নিশ্চিত করতে পেরেছে যা বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে ৩০০ আসনের মধ্যে বিডিপি এবং জাগপার ক্ষেত্রেমাত্র একটি করে আসন ছাড় দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।দলীয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ বৈঠকের পর ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫ থেকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে ৩টি, এবি পার্টিকে ৩টি, এলডিপিকে ৭টি এবং বিডিপিকে ১টি আসন ছাড়ের কথা বলে জামায়াত ইসলামী। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন একপর্যায়ে সমঝোতার আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সূত্রে মতে, ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আকাঙ্খিত সংখ্যায় আসন না পাওয়ায় এই জোটের পুরাতন সঙ্গী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি জোটের প্রার্থীদের আসন দিতে গিয়ে বিভিন্ন আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরও মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা। আসন সমঝোতার বাইরে, এই জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দুই দলের মধ্যে অনেকটা নীরব যুদ্ধও চলছে।দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতা সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং আপাতত যেসব আসনে সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ের অসন্তোষ বেশ প্রকট। আসন নিয়ে দলগুলোর নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এমন সমঝোতা সংকট দেখা দিয়েছে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ছাড় দিয়ে হলেও আলোচনার মাধ্যমে কোনো একটা সমাধান আসা এখনই উপযুক্ত সময়। অন্যথায় সমঝোতার প্রক্রিয়াটিই একটি সংকটে পরিণত হবে। যা ভোটের মাঠে জয় পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে দলগুলোর প্রার্থীদের-এটাই ভাবছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের শক্তি বাড়াতেই জোট। যাদের সাথে জোট করেছে তাদেরও একক শক্তিতে কিছু করার নাই। পরস্পরই পরস্পরকে ব্যবহার করছে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী। সুতরাং এখানে একটা স্বার্থের সংঘাত হলেই জোট ভেঙে যাবে। তিনি মনে করেন, আদর্শগত কোনো জায়গা না থাকার কারণে এ ধরনের জোট বেশি দিন টেকে না। ফলে আসন নিয়ে সমঝোতা সম্পর্কিত স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণেই নির্বাচনের আগেই এই জোট ভেঙে যেতে পারে অথবা নির্বাচনের পরে তা ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।ভোরের আকাশ/র.ই