স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে ভাজা মাছ? গবেষণায় যা জানা গেল

মাছ বাঙালির খাদ্যতালিকায় একটি অপরিহার্য উপাদান। "মাছে-ভাতে বাঙালি" প্রবাদের মতোই প্রতিদিনের খাবারে মাছ না হলে যেন আমাদের চলেই না। পুষ্টিগুণে ভরপুর মাছ হার্ট ভালো রাখা থেকে শুরু করে শরীরের নানা উপকার করে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
গবেষকদের মতে, মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও, অতিরিক্ত কড়া করে ভাজা (Deep Fried) মাছ খাওয়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে, এমনকি এটি ক্যানসারের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ক্যানসার গবেষক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত ভাজা মাছের ক্ষতিকর দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ‘হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস’ (HCAs) তৈরি হওয়া
মাছ যখন উচ্চ তাপমাত্রায় ডুবো তেলে অনেক সময় ধরে কড়া করে ভাজা হয়, তখন মাছের প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং ক্রিয়েটিনিনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস (HCAs) এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনস (PAHs) নামক দুটি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই উপাদানগুলোকে ‘কার্সিনোজেন’ বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
২. ডিএনএ (DNA) পরিবর্তন ও ক্যানসারের ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, কড়া ভাজা মাছের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা এই কার্সিনোজেনগুলো মানবদেহের কোষের ডিএনএ-র (DNA) গঠনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে শরীরে ক্ষতিকর উপাদান জমতে থাকলে তা কোলন ক্যানসার (পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যানসার), অগ্ন্যাশয় (Pancreatic) ক্যানসার এবং প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড নষ্ট হওয়া
মাছের প্রধান গুণ হলো এতে থাকা উচ্চমাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা আমাদের হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সচল রাখে। কিন্তু মাছকে যখন অতিরিক্ত ভাজা বা পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন উচ্চ তাপে এই উপকারী ফ্যাট পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। উল্টো, ডুবো তেলের ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট মাছে প্রবেশ করে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্যানসারের ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকদের পরামর্শ
মাছ খাওয়ার উপকারিতা পুরোপুরি পেতে এবং ক্যানসারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে দূরে থাকতে পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকেরা রান্নার পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন:
- হালকা ভাজা (Shallow Fry): মাছ যদি ভাজতেই হয়, তবে ডুবো তেলে কড়া করে না ভেজে, সামান্য তেল দিয়ে অল্প তাপে হালকা করে ভাজুন। মাছের গায়ে যেন কালো বা পোড়া দাগ না লাগে।
- রান্নার বিকল্প পদ্ধতি: মাছের তরকারি, ভাপে রান্না (যেমন- সর্ষে ইলিশ বা পাতুরি), কিংবা ওভেনে বেক বা গ্রিল করে খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর পদ্ধতি। এতে মাছের পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।
- তেলের সঠিক ব্যবহার: মাছ ভাজার জন্য একবার ব্যবহার করা তেল বারবার ব্যবহার করা যাবে না। পোড়া তেল পুনরায় গরম করলে তাতে ফ্রি-র্যাডিক্যালের মাত্রা বাড়ে, যা ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞের মতামত:
মাছ নিজে ক্ষতিকর নয়, বরং আমাদের ত্রুটিপূর্ণ রান্নার পদ্ধতি একে ক্ষতিকর করে তুলছে। অতিরিক্ত ভাজা বা পুড়িয়ে ফেলা যেকোনো খাবারই স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত। তাই সুস্থ থাকতে কড়া ভাজা মাছের মোহ ত্যাগ করে, পুষ্টিকর উপায়ে মাছ রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই শ্রেয়।
ভোরের আকাশ/জেআ