ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটার যত উপকার

আধুনিক নাগরিক জীবনে জুতো স্যান্ডেল ছাড়া এক মুহূর্তও আমাদের চলে না। ঘর থেকে বের হওয়া মানেই পায়ে দামি জুতো গলিয়ে নেওয়া। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম জুতোর দেয়াল ভেঙে প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় খালি পায়ে হাঁটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। প্রকৃতি এবং মাটির সংস্পর্শে এসে খালি পায়ে হাঁটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘আর্দিং’ (Earthing) বা ‘গ্রাউন্ডিং’ বলা হয়।
ঘাসের ওপর বা মাটিতে নিয়মিত খালি পায়ে হাঁটলে শরীরে কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে করা হলো:
১. দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়
সকালে ঘুম থেকে উঠে সবুজ ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। আমাদের পায়ের পাতায় কিছু নির্দিষ্ট প্রেসার পয়েন্ট বা আকুপ্রেশার বিন্দু থাকে, যা শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত। বিশেষ করে পায়ের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আঙুলের নিচে থাকা স্নায়ুগুলো চোখের দৃষ্টিশক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ঘাসের ওপর হাঁটার সময় এই বিন্দুগুলোতে চাপ পড়ার ফলে চোখের কার্যক্ষমতা বাড়ে।
২. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে
প্রকৃতির সান্নিধ্যে খালি পায়ে হাঁটলে শরীর ও মন নিমেষেই শান্ত হয়ে ওঠে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে শরীরে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ কমতে শুরু করে। একই সাথে মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ হরমোনের মাত্রা বাড়ে, যা মনকে প্রফুল্ল রাখে এবং মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও অনিদ্রার (Insomnia) মতো সমস্যা দূর করে।
৩. রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং হার্ট ভালো রাখে
যখন আমরা খালি পায়ে মাটিতে হাঁটি, তখন পায়ের নিচের পেশি ও রক্তনালীগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালনের (Blood Circulation) প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। রক্ত চলাচল ভালো হওয়ার কারণে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমে, যা পরোক্ষভাবে রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হৃদযন্ত্রের (Heart) স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
৪. পায়ের পেশি ও হাড় মজবুত হয়
জুতো পরে হাঁটার সময় আমাদের পায়ের সব পেশি সমানভাবে ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু খালি পায়ে হাঁটলে পায়ের পাতার প্রতিটি ছোট-বড় পেশি, লিগামেন্ট এবং হাড়ের সঠিক ব্যায়াম হয়। এটি পায়ের গঠনকে মজবুত করে, পায়ের নমনীয়তা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদী গোড়ালি বা পিঠের ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে।
৫. শরীরের ‘ফ্রি-র্যাডিক্যালস’ দূর হয়
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর একটি নিজস্ব প্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক চার্জ রয়েছে। আমরা যখন খালি পায়ে মাটির সংস্পর্শে আসি, তখন মাটি থেকে নেতিবাচক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এই ইলেকট্রনগুলো শরীরের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর ‘ফ্রি-র্যাডিক্যালস’ বা টক্সিনকে প্রশমিত করে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ভেতরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমে আসে।
কিছু জরুরি সতর্কতা:
- খালি পায়ে হাঁটার উপকারিতা অনেক হলেও কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি:
- নোংরা, ভাঙা কাচ, লোহা বা ময়লা আবর্জনাযুক্ত স্থানে খালি পায়ে হাঁটবেন না।
- হাঁটার জন্য ভোরে পার্কের নরম ঘাস, পরিষ্কার মাটি কিংবা সমুদ্রের সৈকতের বালু বেছে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
- ডায়াবেটিসের রোগীদের পায়ে আঘাত লাগলে সহজে শুকাতে চায় না, তাই তারা খালি পায়ে হাঁটার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন এবং সতর্ক থাকবেন।
সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন জিম বা দামি উপকরণের প্রয়োজন নেই। প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে আরোগ্যের চাবিকাঠি। তাই প্রতিদিন সকাল বা বিকেলে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট জুতো জোড়া খুলে সবুজ ঘাস কিংবা মাটির স্পর্শ নিন এবং সুস্থ থাকুন।