বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে জরুরি করণীয়

বাড়িতে, কর্মস্থলে কিংবা রাস্তায় অসাবধানতাবশত বৈদ্যুতিক শকের ঘটনা ঘটতে পারে। বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করতে গিয়ে অনেক সময় আশপাশের মানুষও দুর্ঘটনার শিকার হন। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিতে কয়েকটি জরুরি নিয়ম মেনে চললে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে উদ্ধার করা এবং তাঁর জীবন রক্ষায় সহায়তা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক শকের ঘটনায় প্রথম কাজ হলো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রথমেই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করুন
কেউ বিদ্যুতায়িত হলে তাঁকে সরাসরি স্পর্শ করা যাবে না। কারণ, বিদ্যুতের সংযোগ চালু থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর স্পর্শ করলে উদ্ধারকারীর শরীরেও বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে। প্রথমে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মেইন সুইচ, সার্কিট ব্রেকার বা প্লাগ বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
বিদ্যুৎ বন্ধ করা সম্ভব না হলে নিজে ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সরানোর চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে উচ্চ ভোল্টেজের তার বা ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তারের কাছে যাবেন না। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী বা সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবার সহায়তা নিতে হবে।
জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করুন। গুরুতর শক, অচেতন হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, পোড়া ক্ষত কিংবা হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা ডাকুন। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
শ্বাস-প্রশ্বাস ও সাড়া পরীক্ষা করুন
আক্রান্ত ব্যক্তি সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না, তা পরীক্ষা করুন। তিনি অচেতন হয়ে গেলে বা স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে জরুরি সেবার সহায়তা নিয়ে দ্রুত সিপিআর (CPR) শুরু করতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে বুকের মাঝখানে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার চাপ দিন। প্রশিক্ষণ না থাকলে জরুরি সেবার ফোন অপারেটরের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। কাছে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে সেটি ব্যবহারের ব্যবস্থা করুন।
পোড়া স্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিন
বিদ্যুতের সংস্পর্শে শরীরের বাইরে ছোট ক্ষত দেখা গেলেও ভেতরের টিস্যু ও অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া জরুরি। পোড়া স্থানে পরিষ্কার, শুকনো ও জীবাণুমুক্ত কাপড় বা গজ দিয়ে আলতোভাবে ঢেকে দিন। ক্ষতস্থানে বরফ, তেল, টুথপেস্ট বা কোনো ধরনের মলম লাগাবেন না। ফোসকা ফাটানো কিংবা পোড়া চামড়া টেনে সরানোর চেষ্টা করবেন না।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত ও স্থির রাখুন
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তিকে অযথা নড়াচড়া করতে দেবেন না। পড়ে গিয়ে আঘাত পেলে বা মেরুদণ্ডে চোটের আশঙ্কা থাকলে প্রয়োজন ছাড়া স্থানান্তর করবেন না। তাঁকে উষ্ণ রাখুন এবং চিকিৎসাসেবা আসা পর্যন্ত শ্বাস-প্রশ্বাস ও সাড়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করুন।
যেসব ভুল করা যাবে না
বিদ্যুৎ সংযোগ চালু থাকা অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে খালি হাতে স্পর্শ করা যাবে না। পানি ঢেলে বিদ্যুৎ বন্ধ করার চেষ্টা, ভেজা কাপড় বা ধাতব বস্তু দিয়ে তার সরানো কিংবা নিজে ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করতে যাওয়া বিপজ্জনক। আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ বোধ করলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তাঁকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
মনে রাখবেন
বৈদ্যুতিক শক শুধু বাহ্যিক পোড়ার কারণ নয়; এটি হৃদ্যন্ত্রের ছন্দে সমস্যা, স্নায়ু ও পেশির ক্ষতিও ঘটাতে পারে। তাই বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসার পর আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, জরুরি সহায়তা ডাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিপিআর শুরু করাই জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ভোরের আকাশ/জেআ