রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ সুরমা, কী বলে বিজ্ঞান?

আদিমকাল থেকেই চোখের সৌন্দর্যবর্ধন ও সুরক্ষায় সুরমা বা ‘ইতমিদ’ (Ismid)-এর ব্যবহার অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি কেবল নারীদের সাজসজ্জার উপকরণ নয়, বরং পুরুষদের জন্যও একটি ঐতিহ্যবাহী প্রসাধন। ইসলামে চোখের সুরমা ব্যবহারের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এর বহুবিধ উপকারিতা স্বীকার করেছে।
চোখে সুরমা ব্যবহারের বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের চমৎকার ব্যাখ্যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ইসলাম ও সুরমা ব্যবহারের বিধান: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত
ইসলামে চোখে সুরমা লাগানো অত্যন্ত বরকতময় একটি আমল এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর অন্যতম প্রিয় সুন্নত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে নিয়মিত চোখে সুরমা ব্যবহার করতেন এবং সাহাবিদেরও তা ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন।
- সেরা সুরমা ‘ইতমিদ’:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের জন্য সর্বোত্তম সুরমা হলো ‘ইতমিদ’ (পাথর কেটে তৈরি এক বিশেষ সুরমা)। কারণ এটি চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে এবং চোখের পাপড়ি গজাতে সাহায্য করে।” > (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ৩৪৯৬; সুনানে তিরমিযী)
- সুরমা ব্যবহারের সময় ও নিয়ম:
নবী করীম ﷺ সাধারণত রাতে ঘুমানোর আগে চোখে সুরমা লাগাতেন। হাদিস শরিফে এসেছে—
“রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি সুরমাদানি ছিল, যেখান থেকে তিনি প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন।” > (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং- ১৭৬১)
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, পুরুষ-নারী নির্বিশেষে যেকোনো দিন বা রাতে সুরমা লাগানো সুন্নত। এমনকি রোজা রাখা অবস্থায় চোখে সুরমা লাগালে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না (সহীহ মুসলিম)।
২. আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও উপকারিতা
পবিত্র হাদিসে সুরমার যে গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চক্ষু বিশেষজ্ঞরা গবেষণার মাধ্যমে তার সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন। খাঁটি ও প্রাকৃতিক সুরমা ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক উপকারিতাগুলো হলো:
- দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা: খাঁটি সুরমায় থাকা প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান চোখের ভেতরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। এটি চোখের সিলিয়ারি পেশীগুলোকে সচল রাখতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে দৃষ্টিশক্তিকে পরিষ্কার ও দীর্ঘস্থায়ী করতে ভূমিকা রাখে।
- চোখের পাপড়ি গজানো ও সুরক্ষা: হাদিসের বর্ণনার মতোই বিজ্ঞান বলে, সুরমার উপাদান চোখের পাপড়ির গোড়ায় পুষ্টি জোগায়। এতে পাপড়ি ঘন ও লম্বা হয়। ঘন পাপড়ি বাইরের ধুলাবালি ও ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি (UV Rays) থেকে চোখকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করে।
- জীবাণুনাশক ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা: প্রাকৃতিক সুরমায় এক ধরণের মৃদু অ্যান্টি-সেপটিক গুণ থাকে। এটি চোখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু ধ্বংস করে চোখের ইনফেকশন, অঞ্জনি (Stye) বা চোখ ওঠার ঝুঁকি কমায়।
- চোখের ক্লান্তি দূর করা: বর্তমান যুগে কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে এক ধরণের শুষ্কতা ও ক্লান্তি (Eye Strain) তৈরি হয়। রাতে ঘুমানোর আগে সুরমা লাগালে তা চোখকে ঠান্ডা রাখে এবং চোখের পেশীগুলোকে শিথিল করে চমৎকার ঘুম আনতে সাহায্য করে।
- চোখের অতিরিক্ত পানি পড়া বন্ধ করা: অনেকেরই সামান্য বাতাস বা আলোতে চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়ার সমস্যা থাকে। সুরমার খনিজ উপাদান চোখের অশ্রুগ্রন্থির (Lacrimal Gland) অতিরিক্ত ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে এই সমস্যা উপশম করে।
ব্যবহারকারীদের জন্য জরুরি একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা:
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুরমার উপকারিতা কেবল তখনই পাওয়া যাবে, যখন এটি সম্পূর্ণ খাঁটি ও সীসা-মুক্ত (Lead-free) হবে।
- বাজারে সস্তায় পাওয়া অনেক ভেজাল সুরমায় অতিরিক্ত মাত্রায় লেড বা সীসা (Lead Carbonate) মেশানো থাকে। এই ধরণের রাসায়নিকযুক্ত সুরমা নিয়মিত ব্যবহারে চোখের উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হতে পারে এবং শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
- তাই সুন্নত পালনের পাশাপাশি চোখের সুরক্ষার জন্য সবসময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে আরবের আসল ‘ইতমিদ সুরমা’ বা প্রাকৃতিক ভেষজ সুরমা সংগ্রহ করে ব্যবহার করা উচিত।
আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনুপস্থিতিতে প্রিয় নবী ﷺ চোখের সুরক্ষার যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞান তারই জয়গান গাইছে। আসুন, চোখের সুস্থতা ও সৌন্দর্যের জন্য নিয়মিত রাতে ঘুমানোর আগে এই সুন্দর সুন্নতটি পালনের অভ্যাস গড়ে তুলি।
ভোরের আকাশ/জেআ