চোখের সঠিক যত্নেই কমবে ছানির ঝুঁকি

মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও মূল্যবান অঙ্গগুলোর একটি হলো চোখ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চোখের এক অত্যন্ত সাধারণ ও পরিচিত সমস্যা হলো 'ক্যাটারেক্ট' বা চোখে ছানি পড়া। সাধারণত বার্ধক্যের কারণে চোখের ভেতরের প্রাকৃতিক ও স্বচ্ছ লেন্সটি ঘোলাটে হয়ে যায়, যার ফলে দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে।
যদিও ছানি পড়া বয়সজনিত একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে—অল্প বয়স থেকেই জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং বিশেষ উপায়ে চোখের সঠিক যত্ন নিলে ছানি পড়ার প্রক্রিয়াটিকে অনেক বছর পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। চোখের ছানি প্রতিরোধে ৫টি বিশেষ ও কার্যকরী উপায় নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’ সমৃদ্ধ বিশেষ খাদ্যাভ্যাস
আমাদের চোখের লেন্স মূলত প্রোটিন ও পানি দিয়ে তৈরি। ফ্রি-রেডিক্যালের আক্রমণের কারণে এই প্রোটিন নষ্ট হয়ে লেন্স ঘোলা হতে শুরু করে। তাই খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ পরিবর্তন আনা জরুরি।
- কী খাবেন: ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই এবং বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার চোখের লেন্সকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এজন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আমলকী, লেবু, গাজর, মিষ্টি আলু, পালং শাক, ব্রোকলি এবং বিভিন্ন ধরণের বাদাম রাখুন।
- লুটেন ও জিক্সাথিন: ডিমের কুসুম এবং গাঢ় সবুজ শাকে ‘লুটেন’ ও ‘জিক্সাথিন’ নামক বিশেষ উপাদান থাকে, যা সরাসরি চোখের রেটিনা ও লেন্সের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
২. রোদ চশমা বা ইউভি প্রটেকশন
সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি চোখের লেন্সের প্রোটিন স্ট্রাকচারকে খুব দ্রুত ভেঙে ফেলে, যা অকালে ছানি পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
- বিশেষ যত্ন: ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় ফ্যাশনের জন্য নয়, বরং চোখের সুরক্ষায় অবশ্যই ১০০% ইউভি প্রটেকশনযুক্ত ) ভালো মানের সানগ্লাস ব্যবহার করুন। এছাড়া কড়া রোদে ছাতা বা চওড়া হ্যাট ব্যবহার করলে সরাসরি সূর্যের আলো চোখে পড়ে না।
৩. ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
যাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বা ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাদের চোখে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং কম বয়সেই ছানি পড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ডায়াবেটিক ক্যাটারেক্ট’ বলা হয়।
- বিশেষ যত্ন: নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ডায়াবেটিস থাকলে বছরে অন্তত একবার অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে চোখের রেটিনা ও লেন্স পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক।
৪. ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন
ধূমপানের অভ্যাস কেবল ফুসফুসের ক্ষতি করে না, এটি চোখের লেন্সের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক।
- কেন ক্ষতিকর: ধূমপান করলে শরীরে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিক্যাল তৈরি হয়, যা চোখের লেন্সের স্বচ্ছ কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন অধূমপায়ীর তুলনায় চেইন-স্মোকারদের চোখে ছানি পড়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ থাকে। তাই এই ক্ষতিকর অভ্যাস আজই বর্জন করুন।
৫. ২০-২০-২০ নিয়ম এবং চোখের ড্রপ ব্যবহারে সতর্কতা
আজকের ডিজিটাল যুগে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা লেন্সের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে।
- বিশেষ নিয়ম: কম্পিউটার বা মোবাইলে কাজ করার সময় প্রতি ২০ মিনিট পর পর, ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের পেশী শিথিল হয়।
- ওষুধে সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হুটহাট যেকোনো চোখের ড্রপ (বিশেষ করে স্টেরয়েডযুক্ত ড্রপ) ব্যবহার করবেন না। স্টেরয়েডের দীর্ঘমেয়াদী অপব্যবহার চোখের ছানি পড়ার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ পরামর্শ:
৪০ বছর বয়সের পর থেকে চোখে কোনো সমস্যা না থাকলেও বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করান। প্রাথমিক অবস্থায় লেন্সের কোনো পরিবর্তন ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ যত্নের মাধ্যমে ছানি পড়া প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হয়।
ভোরের আকাশ/জেআ