দীর্ঘ সময় বসে থাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। অফিস-আদালতের ডেস্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে মগ্ন থাকা কিংবা যাতায়াতের সময় দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে বসে থাকা—আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অলস ও গতিহীন জীবনযাত্রাকে বলা হয় ‘সেডেন্টারি লাইফস্টাইল’।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক গবেষণায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন—অতিরিক্ত সময় একটানা বসে থাকার সাথে ক্যানসারের ঝুঁকির সরাসরি ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি একে ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে অনেকে একে ‘নিউ স্মোকিং’ বা নতুন ধূমপান বলে অভিহিত করছেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কীভাবে আমাদের শরীরে ক্যানসারের বীজ বপন করে:
বসে থাকার সাথে ক্যানসারের বৈজ্ঞানিক সংযোগ:
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে একটানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি বসে কাটান, তাদের ক্ষেত্রে প্রধানত ৩ ধরণের ক্যানসারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়:
১. কোলন বা অন্ত্রের ক্যানসার :
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের গতি মন্থর হয়ে যায়। এর ফলে খাবারের ক্ষতিকর উপাদান বা বর্জ্য পদার্থগুলো অন্ত্রে দীর্ঘসময় জমা থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে। এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা কোলনের ভেতরের কোষগুলোর জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, যা পরবর্তীতে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ২৪% বাড়িয়ে দেয়।
২. জরায়ুর ক্যানসার :
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে নারীদের শরীরে হরমোনের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। একটানা বসে থাকার ফলে নারীদের জরায়ুর ভেতরের স্তরে ক্যানসার বা এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৩২% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
৩. ফুসফুসের ক্যানসার :
শারীরিক নড়াচড়া না করলে ফুসফুসের পূর্ণ কার্যক্ষমতা ব্যবহৃত হয় না। ফলে ফুসফুসে অক্সিজেনের আদান-প্রদান সঠিকভাবে হয় না, যা পরোক্ষভাবে ফুসফুসের কোষের ক্ষতি করে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কেন বাড়ে এই ঝুঁকি? (ভেতরের কারণসমূহ)
- ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিস: দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পেশীগুলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ বা চিনি শোষণ করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে শরীরে ইনসুলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ইনসুলিন শরীরে কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন ত্বরান্বিত করে, যা ক্যানসারের মূল কারণ।
- ক্রনিক ইনফ্লেমেশন বা প্রদাহ: নড়াচড়া না করলে শরীরে এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন তৈরি হয়। এই প্রদাহ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে শরীর ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না।
- ওজন বৃদ্ধি ও মেদভুঁড়ি: অতিরিক্ত বসে থাকার সরাসরি ফলাফল স্থূলতা বা ওবেসিটি। চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত ওজন শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে স্তন ক্যানসার এবং জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
একটি বড় ভুল ধারণা: "আমি তো রোজ জিম করি!"
অনেকে ভাবেন, সকালে এক ঘণ্টা দৌড়ে বা জিমে গিয়ে ব্যায়াম করলেই হয়তো সারাদিন ৮-১০ ঘণ্টা বসে থাকার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, এটি একটি ভুল ধারণা। সকালে তীব্র ব্যায়াম করার পরও যদি কেউ ডেস্কে একটানা ৫-৬ ঘণ্টা নড়াচড়া না করে বসে থাকেন, তবে তার ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় বেশিই থেকে যায়। অর্থাৎ, সকালের ব্যায়াম সারাদিনের একটানা বসে থাকার ক্ষতি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
ঝুঁকি এড়াতে সহজ সমাধান:
কাজের প্রয়োজনে আমাদের বসে থাকতেই হবে, তবে কিছু কৌশলের মাধ্যমে এই ঝুঁকি সহজেই এড়ানো সম্ভব:
- ২০-৩০ মিনিটের নিয়ম: প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট একটানা বসে থাকার পর অন্তত ২ মিনিটের জন্য সিট থেকে উঠুন। একটু হাত-পা টানটান করুন বা কলিগদের সাথে কথা বলতে হেঁটে যান।
- হাঁটার অভ্যাস: অফিসে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। ডেস্কে বসেই পানির বোতল রিফিল করতে নিজে উঠে যান। ফোন কল এলে দাঁড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে কথা বলার অভ্যাস করুন।
- স্ট্যান্ডিং ডেস্ক: সম্ভব হলে অফিসে এমন ডেস্ক ব্যবহার করুন যেখানে দাঁড়িয়েও কিছু সময় কাজ করা যায়।
- খাবারে সচেতনতা: অলস জীবনযাত্রার পাশাপাশি ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করুন। খাদ্যতালিকায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল রাখুন।
আমাদের শরীর তৈরি হয়েছে সচল থাকার জন্য, স্থবির হয়ে থাকার জন্য নয়। ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে আজই নিজের অলস অভ্যাস বদলান। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু নড়াচড়া করার এই ছোট অভ্যাসটিই আপনার জীবনকে দিতে পারে দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা।
ভোরের আকাশ/জেআ