অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে চোখ হারাচ্ছে ঢাকার শিশুরা!

রাজধানী ঢাকার শিশুদের মাঝে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে চোখের নানাবিধ সমস্যা। অতিরিক্ত সময় ধরে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে শৈশবেই দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসছে হাজারো শিশু। চিকিৎসকেরা একে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’ বা ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’-এর মারাত্মক পরিণতি হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন চক্ষু হাসপাতালে শিশুদের চোখের সমস্যা নিয়ে আসা অভিভাবকদের ভিড় এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খেলার মাঠের অভাব এবং করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের পর থেকে শিশুদের প্রযুক্তি-নির্ভরতা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
১. ‘স্ক্রিন টাইম’ ও চোখের রোগ: ভয়াবহ পরিসংখ্যান
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ ঢাকার প্রধান প্রধান চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে আউটডোরে আসা শিশুদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে স্ক্রিনজনিত চোখের সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে 'মায়োপিয়া' বা ক্ষীণদৃষ্টি। অর্থাৎ, শিশুরা দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখতে পায় না, যার কারণে খুব ছোট বয়সেই তাদের চোখে ভারী চশমা তুলতে হচ্ছে।
২. কী ধরনের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে শিশুদের মাঝে?
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ঢাকার শিশুদের মধ্যে মূলত নিচের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলো তীব্র হচ্ছে:
- চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া (Dry Eye): স্বাভাবিকভাবে মানুষ মিনিটে ১৫-২০ বার চোখের পলক ফেলে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় তা কমে মাত্র ৪-৫ বার হয়। ফলে চোখের জল শুকিয়ে চোখ লাল হয়ে যায় ও চুলকায়।
- ঘন ঘন মাথা ব্যথা ও ঝাপসা দেখা: একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে শিশুর মাথা ব্যথা ও অলস চোখ (Lazy Eye) তৈরি হয়।
- অনিদ্রা ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া: স্ক্রিন থেকে নির্গত 'নীল আলো' (Blue Light) মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে শিশুদের ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে এবং তারা জেদি ও খিটখিটে হয়ে ওঠে।
৩. খেলার মাঠের অভাব ও ইনডোর কালচার
ঢাকার এই পরিস্থিতির জন্য শহরের অবকাঠামোকেও দায়ী করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। রাজধানীতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ বা পার্ক না থাকায় শিশুরা চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়ছে। বিকেলবেলা বাইরে গিয়ে শারীরিক কসরত বা খেলাধুলার সুযোগ না পাওয়ায় বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছে মা-বাবার মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার গেম। অনেক সময় কর্মব্যস্ত মা-বাবারাও সন্তানকে শান্ত রাখতে বা খাবার খাওয়াতে স্ক্রিন সামনে তুলে দিচ্ছেন, যা পরোক্ষভাবে আসক্তি তৈরি করছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ: বাঁচার উপায় কী?
ঢাকার প্রখ্যাত শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই অভিভাবকরা সচেতন না হলে আগামী প্রজন্ম এক বিশাল দৃষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়বে। এই সংকট থেকে শিশুদের বাঁচাতে চিকিৎসকেরা কয়েকটি জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
- ২ বছরের নিচে ‘নো স্ক্রিন’: দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো ধরনের ডিজিটাল স্ক্রিন দেখানো যাবে না। এবং ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা (নিয়ন্ত্রিতভাবে) করা উচিত।
- ‘২০-২০-২০’ নিয়ম (20-20-20 Rule): প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর, ২০ সেকেন্ডের জন্য অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকাতে হবে। এতে চোখের পেশি বিশ্রাম পায়।
- বিকল্প বিনোদন তৈরি: শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে বই পড়া, ছবি আঁকা, ইনডোর গেমস (লুডু, দাবা) কিংবা গাছপালার যত্ন নেওয়ার মতো সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে।
- বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা: শিশুর চোখ বারবার লাল হলে, সে যদি চোখ কুঁচকে বা খুব কাছ থেকে টিভি দেখে, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
বিশেষজ্ঞের মন্তব্য:
"ডিজিটাল ডিভাইস বর্তমান যুগের প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন শিশুর চোখের আলো কেড়ে না নেয়। ঢাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় শিশুদের জন্য খেলার জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া এবং মা-বাবার কোয়ালিটি টাইম দেওয়াই পারে এই ভয়াবহ সংকট থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করতে।"
ভোরের আকাশ/জেআ