খাওয়ার পর ঘুম পায় কেন

দুপুরে এক থালা গরম ভাত তৃপ্তি করে খাওয়ার পর শরীরজুড়ে এক মায়াবী অলসতা নেমে আসে না—এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া বিরল। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা আর বিছানায় একটু পিঠ ঠেকানোর এই তীব্র ইচ্ছাকে আমাদের গ্রামীণ ভাষায় বলা হয় ‘ভাত-ঘুম’।
দুপুরবেলা ভাত খাওয়ার পর কেন আমাদের এত ঘুম পায়, তা কিন্তু মোটেও অলসতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও শারীরবৃত্তীয় কারণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ট্রিপটোফ্যান ও সেরোটোনিনের খেলা
ভাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। আমরা যখন বেশি পরিমাণে শর্করা জাতীয় খাবার খাই, তখন শরীরে ‘ইনসুলিন’ হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়।
- শরীরে যা ঘটে: এই ইনসুলিন রক্তে থাকা ‘ট্রিপটোফ্যান’ নামক একটি অ্যামাইনো অ্যাসিডকে খুব সহজে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কে গিয়ে এই ট্রিপটোফ্যান রূপান্তরিত হয় ‘সেরোটোনিন’ এবং পরবর্তীতে ‘মেলাটোনিন’ হরমোনে। এই মেলাটোনিন হলো মূলত আমাদের শরীরের ‘ঘুমের হরমোন’। এর ফলে মস্তিষ্ক শিথিল হয়ে পড়ে এবং আমাদের দ্রুত ঘুম পেতে থাকে।
২. পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ভাত খাওয়ার পর ঘুম আসার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল সমনোলেন্স’।
- শরীরে যা ঘটে: ভারী খাবার খাওয়ার পর তা হজম করার জন্য আমাদের পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এই হজম প্রক্রিয়া সচল রাখতে শরীরের সিংহভাগ রক্ত ও শক্তি পাকস্থলীর দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ কিছুটা কমে যায়। মস্তিষ্কে শক্তির এই ঘাটতির কারণেই শরীর ঝিমিয়ে পড়ে এবং অলসতা ও ঘুম ভাব তৈরি হয়।
৩. ভাতের উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স
অন্যান্য অনেক শর্করার তুলনায় সাদা ভাতের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশ বেশি।
- শরীরে যা ঘটে: উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকার কারণে ভাত খাওয়ার পরপরই তা দ্রুত ভেঙে রক্তে গ্লুকোজ বা সুগারের মাত্রা এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। শরীর তখন তাৎক্ষণিক শক্তি পায়। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই যখন রক্তের সেই সুগারের মাত্রা আবার দ্রুত নামতে শুরু করে , তখনই শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত বোধ করে এবং ঘুম চলে আসে।
‘ভাত-ঘুম’ বা দুপুরের অলসতা কাটানোর কিছু সহজ উপায়:
দুপুরের কাজের ফাঁকে বা অফিসে এই ঘুমের ভাব কাটানো বেশ জরুরি। এর জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে পারেন:
১. ভাতের পরিমাণ কমানো: দুপুরের খাবারে শর্করার (ভাত) পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম) এবং ফাইবারের (সবজি, সালাদ) পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। প্লেটের অর্ধেকটা সবজি ও এক-চতুর্থাংশ ভাত রাখলে ঘুম ভাব কম হবে।
২. ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া: তাড়াহুড়ো করে না খেয়ে খাবার ভালোমতো চিবিয়ে খান। এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং পরিপাকতন্ত্রের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।
৩. খাওয়ার পর একটু হাঁটা: ভাত খাওয়ার পরপরই বিছানায় বা চেয়ারে ঝিমিয়ে না পড়ে অন্তত ১০-১৫ মিনিট ঘরের ভেতর বা অফিসের করিডোরে একটু হালকা পায়চারি করুন। এতে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান: শরীর ডিহাইড্রেটেড বা পানিশূন্য থাকলে ক্লান্তি ও ঘুম ভাব বেশি হয়। তাই সারাদিন ও খাওয়ার বিরতিতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
ভাত খাওয়ার পর ঘুম আসা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। তবে আপনি যদি কর্মজীবী হন বা দুপুরে সচল থাকতে চান, তবে দুপুরের খাবারে ভাতের আধিক্য কিছুটা কমিয়ে এনে সহজেই এই ‘ভাত-ঘুম’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
ভোরের আকাশ/জেআ