‘ছেলেডারে বাঁচা-মরা কিছুই জানি না, হাড্ডি-গুড্ডি হইলেও খুঁজে দ্যান’—বাবা-মায়ের আকুতি
ভ্যান ও জুতা উদ্ধার, তিন মাসেও সন্ধান মেলেনি ইমরানের

‘ভ্যানটা পাওয়া গেছে, ছেলের জুতা পাওয়া গেছে—কিন্তু আমার ছেলেডারে তো পাই নাই। প্রতিদিন মনে হয়, এই বুঝি দরজায় এসে দাঁড়াবে ইমরান। আবার ভয় হয়, কোনো অঘটন ঘটেনি তো!’—কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজেরা বেগম। ১৩ বছরের ছেলে ইমরান খান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে প্রতিটি দিন তাঁর কাটছে অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠায়।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া ভদ্রপাড়া গ্রামের বাসিন্দা চুন্নু খান ও হাজেরা বেগম দম্পতির সন্তান ইমরান। নিখোঁজের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। ছেলের ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও জুতা উদ্ধার হলেও ইমরানের খোঁজ না পাওয়ায় দিশেহারা পরিবারটি। সন্তান বেঁচে থাকলে তাকে ফিরে পেতে চান তাঁরা। আর কোনো অঘটন ঘটে থাকলে অন্তত তার পরিণতি জানতে চান অসহায় বাবা-মা।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন ধান ভাঙানোর কথা বলে প্রতিবেশী শামীম মোল্যা (২১) চুন্নু খানের ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বের হন। এরপর থেকেই নিখোঁজ হয় ইমরান। ওই দিন সকাল থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।
স্বজনদের অভিযোগ, শামীম মোল্যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইমরানের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য দেন। এতে পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়ে। ঘটনার তিন দিন পর, ১৭ জুন বিকেলে পাশের মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রামের এলিনা বেগমের বাড়ি থেকে ইমরানের ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে একটি পাটখেত থেকে তার ব্যবহৃত জুতা ও একটি কোদালও উদ্ধার করা হয়। তবে এসব আলামত উদ্ধারের পরও নিখোঁজ কিশোরের কোনো সন্ধান মেলেনি।
এ ঘটনায় নিখোঁজের দিনই সালথা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন ইমরানের বাবা চুন্নু খান। মামলাটির তদন্তে এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কয়েকজন জামিনে রয়েছেন এবং দুজন কারাগারে আছেন। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম মোল্যা এখনো পলাতক।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইমরানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে পরিবারটি। সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁদের চোখেমুখে উদ্বেগ আর হতাশার ছাপ। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। তাঁদের একটাই আকুতি—সন্তানকে ফিরে পাওয়া, কিংবা তার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।
ইমরানের বাবা চুন্নু খান বলেন, ‘তিন মাস ধইরা আমার ছেলের কোনো খোঁজ নাই। সে বাঁচে আছে নাকি মারা গেছে, কিছুই জানি না। আমরা গরিব মানুষ। ছেলেডারে খুঁজতে কত জায়গায় ঘুরছি। আমার ছেলেডা যদি বাঁচে থাকে, তারে ফিরাইয়া দেন। আর যদি কোনো অঘটন হইয়া থাকে, হাড্ডি-গুড্ডি হইলেও খুঁইজ্যা দ্যান।’
ইমরানের মা হাজেরা বেগম বলেন, ‘ভ্যানটা পুলিশ উদ্ধার করছে, কিন্তু আমার ছেলেডারে পাই নাই। ছেলেকে খুঁজতে ফরিদপুর হাসপাতাল, মুকসুদপুর হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় গেছি। কোথাও তার সন্ধান পাইনি। প্রতিদিন মনে হয়, আজ বুঝি আমার ছেলে ফিরে আসবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মামলা হওয়ার দিনই মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রাম থেকে এনায়েত শেখের স্ত্রী এলিনা বেগমকে (৩২) আটক করা হয়। তাঁর বাড়ি থেকেই ইমরানের ব্যবহৃত ভ্যানটি উদ্ধার করা হয়। একই দিন শামীম মোল্যা আত্মগোপনে চলে যান। পরে তাঁর বাবা টুকু মোল্যা (৬৫) ও স্ত্রী সাথী বেগমকে (২১) আটক করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রাম থেকে রাসেল মাতুব্বর (২১) নামের আরও এক যুবককে আটক করা হয়। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, ইমরান নিখোঁজের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন জামিনে রয়েছেন এবং দুজন কারাগারে আছেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম মোল্যা পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ওসি আরও বলেন, শামীম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে ইমরান নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
তিন মাস ধরে ছেলের অপেক্ষায় দিন গুনছেন চুন্নু খান ও হাজেরা বেগম। প্রতিদিনই তাঁরা আশায় থাকেন, এই বুঝি দরজায় এসে দাঁড়াবে তাঁদের আদরের ইমরান। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা ছাড়তে পারছেন না তাঁরা। এখন তাঁদের একটাই প্রশ্ন—কোথায় ইমরান, কী হয়েছে তার?
ভোরের আকাশ/সু.পা