বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ রোহিঙ্গারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দার দাবি, চক্রটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই অপহরণ, নির্যাতন কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে বালুখালী ৮ ওয়েস্ট ক্যাম্পে গিয়ে একাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অপরাধী চক্রের ভয়ে অনেক পরিবার সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পান না। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আতঙ্কের কারণে অনেক পরিবার নিজ ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্প কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় কথিত শীর্ষ মাদক কারবারি নবী হোসেন গ্রুপের কয়েকজন সদস্য বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ক্যাম্পে এনে পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয়। পাশাপাশি অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে তারা হলেন একই ক্যাম্পের আব্দুল হাকিমের পুত্র আমিন উল্লাহ, নজিরে পুত্র নুর কামাল, জকরিয়ার পুত্র মোহাম্মদ আয়ুব ও নজির আহমেদ'র পুত্র ফয়েজ কামাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, আমিন উল্লাহ অতীতে আরসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে কথিত নবী হোসেন গ্রুপের হয়ে ক্যাম্পে প্রভাব বিস্তার করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ক্যাম্পের বাসিন্দা শামসুল আলম বলেন, তাদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমি অন্য ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছি। তারা নিয়মিত মাদকের চালান নিয়ে আসে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ধরে নিয়ে যায় অথবা হত্যার হুমকি দেয়। তাই ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিমা খাতুন বলেন, "আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। কিন্তু প্রতি মাসে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা দিতে না পারলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, মাঝেমধ্যে লোকজনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি।
আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, অপরাধী চক্রের সদস্যরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখায়। কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলে পরে সেই ব্যক্তিকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ক্যাম্প প্রশাসনকে একাধিকবার মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অপরাধীদের তৎপরতা আরও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্যাম্প-ইন-চার্জ (সিআইসি) রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"অভিযুক্তরা মুঠোফোন রিসিভ না করার কারনে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) সিরাজ আমিন বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা বালুখালী ৮ ওয়েস্ট ক্যাম্পে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সাধারণ রোহিঙ্গারা নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারবেন এবং ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ভোরের আকাশ/রই