রূপগঞ্জে তিন শতাধিক স্পটে মাদকের কারবার, নিয়ন্ত্রণে ৩৫ সিন্ডিকেট

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাদকের বিস্তার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। উপজেলার তিন শতাধিক স্পটে প্রকাশ্যে চলছে মাদক কেনাবেচা। এসব স্পটের অনেকগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ৩২ থেকে ৩৫টি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলা ও মামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এমনকি মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় সম্প্রতি হামলার শিকার হয়েছেন এক পুলিশ সদস্য। গত ৫ নভেম্বর রাতে তারাবো পৌরসভার উত্তর মাসাবো এলাকায় ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে এসে মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় আবুল কালাম (৩৫) নামে ওই পুলিশ কনস্টেবলের হাত-পা ভেঙে দেওয়া এবং পায়ের রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, মাদক নির্মূলে প্রশাসনের অভিযানে গত ছয় মাসে পাঁচ শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আলী আহম্মেদ। মাদক সেবনের অভিযোগে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি দল থেকেও তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
এছাড়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ এবং সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসনকেন্দ্র এলাকায় শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পট নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৩২ থেকে ৩৫টি সিন্ডিকেট। গোলাকান্দাইল সাওঘাট এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনে মাদক মজুত রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গোলাকান্দাইলের ৫ নম্বর ক্যানেল, উত্তরপাড়া বালুরমাঠ, কালী মজলিসের বাগ, মুসলিমপাড়ার কাঁঠালবাগান, ভুলতার মর্তুজাবাদ, ছোনাবো, তারাবো পৌরসভার হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, বরাবো এবং কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নগরপাড়া, বাগবাড়ী, দেলপাড়া, নয়ামাটি, কামশাইর ও বরুণা এলাকায় মাদকের বিস্তার রয়েছে।
গোয়ালপাড়া ও পূর্বাচল উপশহরেও চলছে মাদকের বাণিজ্য। রাতালদিয়া, সাওঘাট, পূর্ব দরিকান্দি, মাছিমপুর, রূপসী সুইসগেট, কালাদি, আতলাশপুর, হাটাবো টেকপাড়া, গন্ধর্বপুর ও দক্ষিণ মাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। তারাবো দক্ষিণপাড়ার নবি হোসেন, নাজমুল ও রাসেল এবং উত্তরপাড়ার মানিক, রিফাত, বিল্লাল ও ইমনের বিরুদ্ধে অবাধে মাদক ব্যবসা চালানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, চনপাড়ার মাদক সিন্ডিকেটে কয়েকশ নারীকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। কখনো বেদে বহর, কখনো লবণবাহী সাম্পান, আবার কখনো সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজ ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করা হয়। হেরোইন, ইয়াবা ও ফেনসিডিলের পাশাপাশি স্কাফ, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে আধুরিয়া পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় সাত শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত কয়েক লাখ শ্রমিকের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের ভাড়া বাসা, মেস ও ছোট ছোট ঘরে মাদক কারবারিরা ফেরি করে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে।
সড়ক ও নৌপথে রূপগঞ্জে মাদক প্রবেশ করছে। বালু নদকে মাদক প্রবেশের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নদটিতে নিয়মিত পুলিশি টহল না থাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে মাদক আনা-নেওয়া করা হয়। শীতলক্ষ্যা নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজেও মাদক আসছে। পাশাপাশি ঢাকা বাইপাস সড়ক দিয়ে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিভিন্ন যানবাহনে মাদক পরিবহন করা হচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা এলাকাকে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। আখাউড়া, কুমিল্লা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বাস, নাইট কোচ, সংবাদপত্র বহনকারী মোটরসাইকেল ও ট্রাকযোগে মাদক আনা হয়। কাঞ্চন সেতু থেকে পলখান পর্যন্ত সড়কের পাশের কয়েকটি রেস্টুরেন্টেও গাঁজার আসর বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব আসরে ট্রাকচালকদের কেউ কেউ অংশ নেন।
চনপাড়া বস্তিতে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটেছে হত্যাকাণ্ডও। গত এক যুগে মাদক সেবনে বাধা দেওয়া ও মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় ২০ থেকে ২২ জন খুন হয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযানের খবর আগেই পৌঁছে যাওয়ায় অনেক সময় কারবারিরা পালিয়ে যায়। মাদক পরিবহনে টোকাই, শিশু-কিশোর ও নারীদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম ফারুক খোকন বলেন, মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাহউদ্দিন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। রূপগঞ্জের অনেক এলাকা দুর্গম। বিশেষ করে চনপাড়া বস্তি অত্যন্ত ঘিঞ্জি। পুলিশ প্রবেশের আগেই খবর পেয়ে মাদক কারবারিরা নিরাপদে পালিয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ এবং সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিক বলেন, মাদক ব্যবসা ও সেবন নির্মূলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও কাজ করছেন। গত এক মাসে দেড় শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই মাদক নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপু বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক কারবারিদের সঙ্গে তাঁর কিংবা রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দলের কোনো নেতাকর্মী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।
ভোরের আকাশ/সু.পা