দুই হাত নেই, মুখে কলম—অদম্য রিয়াদের দাখিল পাস, স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার

নওগাঁর নিয়ামতপুরের বালিচাঁদ গ্রামের রিয়াদ হাসানের দুই হাত নেই। তবুও থেমে যায়নি তার স্বপ্ন। মুখে কলম ধরে লিখেই জীবনের প্রতিটি প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলছে সে।
এবার ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ২.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির আরেকটি প্রমাণ দিয়েছে রিয়াদ। তার স্বপ্ন—পড়াশোনা শেষ করে একজন শিক্ষক হওয়া।
চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মসজিদের ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন লাইনের তারে বিদ্যুতায়িত হয় রিয়াদ। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়। মুহূর্তেই বদলে যায় তার জীবন। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার পড়াশোনার আগ্রহ কিংবা স্বপ্নকে থামাতে পারেনি।
দুই হাত হারানোর পর অন্যদের মতো হাতে কলম ধরে লেখা সম্ভব ছিল না। তাই মুখে কলম ধরে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলে রিয়াদ। ধীরে ধীরে মুখ দিয়েই লেখা, পরীক্ষায় অংশগ্রহণসহ পড়াশোনার প্রায় সব কাজ নিজের মতো করে করার সক্ষমতা অর্জন করে সে। শুধু পড়াশোনায় নয়, দৈনন্দিন অনেক কাজও অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজেই করার চেষ্টা করে রিয়াদ।
রিয়াদ নওগাঁর নিয়ামতপুর সদর ইউনিয়নের বালিচাঁদ গ্রামের দিনমজুর আমিনুল ইসলামের বড় ছেলে। দুই সন্তানের সংসারে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। বালিচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকরাও তাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন। পরে গ্রামের পাশের বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয় সে। সেখান থেকেই এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে।
রিয়াদ বলেন, আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া। শিক্ষকতা আমার সবচেয়ে পছন্দের পেশা। আমি পড়াশোনা শেষ করে একজন শিক্ষক হতে চাই। এই স্বপ্ন পূরণে সরকারপ্রধানসহ সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা চাই।
রিয়াদের এই পথচলার পেছনে রয়েছে তার বাবা আমিনুল ইসলামের দীর্ঘ সংগ্রাম। দিনমজুরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচও বহন করতে হয়েছে তাকে। ছেলের দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের ভুটভুটিও বিক্রি করে দেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেক কষ্ট করে দিনমজুরি করে দুই ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। রিয়াদের দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসার জন্য আমার ভুটভুটিটাও বিক্রি করে দিয়েছি। এখন একটাই আশা—ছেলে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল আলম বলেন, রিয়াদ অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। দুই হাত না থাকলেও মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রিয়াদের পরিবার জানায়, দাখিলের পর তার পড়াশোনা আরও এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন হবে বাড়তি অর্থের। সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন। তাই রিয়াদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে সরকার এবং সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার।
ভোরের আকাশ/ইউএম