কমলনগরে অধ্যক্ষের সিন্ডিকেটে জিম্মি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট হামেদিয়া কামিল এমএ মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেনের গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে ৪-৫ জন শিক্ষককে নিয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না কেউ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই জুটছে লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। অনিয়ম ও অবৈধ উপার্জনের পার্সেন্টেজ বাণিজ্যের কারণে ইতোমধ্যে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘মিস্টার টুয়েন্টি পার্সেন্ট’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) আবদুস সহিদ শুভ কর্মস্থলে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন। সম্প্রতি একদিন তিনি অনুপস্থিত থাকায় তাঁর ১ম, ৩য় ও ৬ষ্ঠ পিরিয়ডের ক্লাস অন্য শিক্ষকদের মাঝে বণ্টন করা হয়। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তিনি অনুপস্থিত থেকেও পরবর্তীতে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। অধ্যক্ষের প্রত্যক্ষ মদদে প্রতি মাসে এভাবেই একাধিক দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নির্বিঘ্নে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন এই শিক্ষক।
জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক আবদুস সহিদ শুভর বাড়ি রংপুরে। এমপিও নীতিমালা তোয়াক্কা না করে তিনি রংপুরে ‘স্টাডি জোন’ নামে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছেন। বিধিমালা লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষ তাঁকে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ দিনের ছুটির অবৈধ সুবিধা করে দিচ্ছেন। যে কয়দিন প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন, সেদিনও ক্লাসে পাঠদানের পরিবর্তে কোচিং সেন্টারের প্রচারণা ও অনর্থক গল্প শুনিয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার্থীদের তাঁর নিজ কোচিং ও প্রাইভেটে পড়তে বাধ্য করা হয়। তাঁর কাছে প্রাইভেট না পড়লে মিলছে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। গাইড বই থেকে শিট কপি করে তা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কাছে বাধ্যতামূলক বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে রংপুর নিবাসী গণিত বিভাগের অপর সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও।
অভিযোগ উঠেছে, ২০ থেকে ৩০ পার্সেন্ট কমিশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বা উৎকোচের বিনিময়ে এসব শিক্ষকের যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির ছাতা ধরে আছেন অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন। এই সমস্ত কূটকৌশল ও অবৈধ অর্থের পথ দেখিয়ে অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন সহকারী অধ্যাপক নুরুল হুদা, যিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে অধ্যক্ষের অপকর্মের প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে এই চারজনের সিন্ডিকেটের কাছে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক শিক্ষা পরিবেশ জিম্মি হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের মাঝে সন্তানদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবন নিয়ে চরম শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয় করে মাদ্রাসার একাডেমিক ভবনের (আশ্রয়ণ ভবনের ৪র্থ তলা) ওপর নিজের ব্যক্তিগত বাসভবন গড়ে তুলেছেন এবং বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়াও অপকর্মে সহযোগী অভিযুক্ত দুই সহকারী শিক্ষক আবদুস সহিদ শুভ ও মোস্তাফিজুর রহমানকে একাডেমিক ভবনেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ফলে মাদ্রাসায় তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট তৈরি হয়ে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক জানান, “এখানে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললেই হেনস্তা, হুমকি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেটের বিরোধিতা করায় এক শিক্ষকের টাইম স্কেল দীর্ঘ ৩ বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে, যা এখনো ব্যানবেইসে (BANBEIS) প্রেরণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবক মহল।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আপনি ফেসবুকের কমেন্টগুলো পড়লেই সত্যতা বুঝতে পারবেন।”
ভোরের আকাশ/ এনউব