বঙ্গোপসাগরে ৯ মাস ধরে নিখোঁজ চার জেলার ১১ জেলে, উৎকণ্ঠায় পরিবার

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলমগীর মাঝিসহ চার জেলার ১১ জন জেলে গত প্রায় ৯ মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা জীবিত আছেন না মারা গেছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পরিবারগুলো। প্রিয়জনদের অপেক্ষায় দিন কাটছে তাদের পরিবারগুলোর চরম উৎকণ্ঠায়। অবিলম্বে নিখোঁজ জেলেদের সন্ধান পেতে ও তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্বজনরা।
নিখোঁজ আলমগীর মাঝি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীপাড়ের সুজন গ্রামের বাসিন্দা। পাঁচ মেয়ের জনক আলমগীর ছিলেন ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা কখন ফিরবেন, সেই আশায় প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকে তার ছোট মেয়েরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে ‘এফবি শরিফা-২’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে করে সাগরে যান আলমগীরসহ ১১ জন জেলে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের ৩ জন, নোয়াখালীর ৪ জন, কুমিল্লার ২ জন এবং চট্টগ্রামের ২ জন রয়েছেন।
নিখোঁজ অপর জেলেরা হলেন—লক্ষ্মীপুরের মামুন মিস্ত্রি ও তছির আহমেদ, নোয়াখালীর আজাদ (৩০), আজাদ (২৭), ইমাম উদ্দিন হোসেন ও সালাউদ্দিন, চট্টগ্রামের রুবেল ও মিলন মিয়া এবং কুমিল্লার ফজলে এলাহী ও ইসমাইল।
নিখোঁজ আলমগীরের মেয়ে জেসমিন বেগম জানান, তার বাবা এর আগে একই ট্রলারে দুবার সাগরে গেলেও তৃতীয়বার যাওয়ার আগে ট্রলার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। ট্রলারটি ছেড়ে দিতে চাওয়ায় মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধও হয়েছিল এবং ঘটনার দিন তাকে ফোনে হুমকি দিয়ে জোড় করে ট্রলারে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এছাড়া নিখোঁজের পর ট্রলার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো সদুত্তর দেননি, বরং আইনি পদক্ষেপ নিলে উল্টো জেলেদের বিরুদ্ধে ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বাধ্য হয়ে ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় চারজনকে আসামি করে অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) তদন্তাধীন রয়েছে। মামলার আসামিরা হলেন—ট্রলার মালিক মাইন উদ্দিন নাহিদ কোম্পানি, নুরুল ইসলাম রাসেল, মোহাম্মদ বেলাল ও কামাল মেম্বার।
পুলিশের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ডিবির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, রিয়াজ উদ্দিন বাজারের ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৫০ বস্তা সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে ট্রলারটি মিয়ানমারের উদ্দেশে গিয়েছিল।
মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা এক জেলের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি অনুযায়ী, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ট্রলারের মাঝি-মাল্লাদের আটক করেছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নিখোঁজ জেলেদের একটি অংশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় আরাকান আর্মির কাছেও আটক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে পরিবারের পক্ষ থেকে বিজিবি মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’-এর উদ্যোগে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও কান্নায় দিন পার করছে জেলে পরিবারগুলো।
ভোরের আকাশ/এম