গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ রেল রুটে ট্রেন ও বগি সংকট, যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া (গোয়ালন্দ ঘাট) রেল স্টেশন থেকে কুষ্টিয়া জেলার পোড়াদহ রেল রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন ও বগি সংকটে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
২৪ ঘন্টায় দিনের বেলায় ২টি লোকাল সাটল ট্রেন চলাচল করে এই রুট দিয়ে। ৮টি বগির স্থলে ৪-৫ টি পুরাতন বগি দিয়ে ট্রেন ২টি ধীর গতিতে চলাচল করে। উক্ত ট্রেনে ১ম শ্রেণীর কোন বগি নেই। গোয়ালন্দ ঘাট-রাজবাড়ী-পোড়াদহ ৫১৩/ ৫০৬/ ৫০৫/ ৫০৮ /৫০৭ সাইন বোর্ড দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন ২টি চলাচল করছে।
জানা যায়, ১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ বাজার রেল স্টেশন থেকে ভারতের কোলকাতা পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে ৭-৮ টি ট্রেন চলাচল করতো| গোয়ালন্দ ঘাট রেল স্টেশনের পাশেই ছিল স্টিমার ও লঞ্চঘাট। পদ্মা নদীর ডুব চর ও পলি মাটি পড়ায় গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ৪ কিলোমিটার অদূরে দৌলতদিয়া রেল স্টেশনটি ১৯৮৪ সালে ঢাকাগামী যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ও রেলের আয় বৃদ্ধির জন্য চালু করা হয়।
লাভজনক এই রেল পথটি রেল বিভাগের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারণে লোকসানী রেলস্টেশনে পরিনত হয়। রেল বিভাগের চরম উদাসীনতার কারণে রাজশাহী জেলা থেকে গোয়ালন্দ ঘাটগামী মধুমতি ট্রেন, পার্বতীপুর থেকে শিলিগুড়ি ট্রেন, খুলনা থেকে নকশী কাথা মেইল ট্রেন, আন্তঃনগর ট্রেন তিতুমীর দর্শনা থেকে দৌলতদিয়াগামী ট্রেনসহ বেশকিছু ট্রেন এই রুটে চলাচল করতো।
বিভিন্ন সময়ে বগি সংকট ও লোকসান দেখিয়ে বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে| বাংলাদেশ রেল লাইনের রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাচুরিয়া, খানখানাপুর, বসন্তপুর স্থানে রেল স্টেশন থাকলেও নিয়মিতভাবে কোন ট্রেন দাড়ায় না এবং স্টেশনে নেই কোন স্টেশন মাস্টার। বর্তমানে একটি ট্রেন পোড়াদহ পর্যন্ত দিনে আপ-ডাউন করে চলাচল করছে।
গোয়ালন্দের কৃতি সন্তান অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম লিন্টু জানান, ১৯৮৪ সালে তিনি কলেজের ছাত্র অবস্থায় প্রথম ট্রেনে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত ট্রেনের প্রথম যাত্রী ছিলেন। ট্রেনেই রাজবাড়ী কলেজে নিয়মিত যাতায়ত করে লেখাপড়া করেছেন| ট্রেনের ভাড়া কম ও নিরাপদ যাত্রার জন্য যাত্রীদের নিকট রেলের সেবা পূর্বে খুবই ভালো ছিল। যাত্রীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনিয়মিত ট্রেন চলাচলের কারণে ট্রেনের যাত্রী এখন আর পূর্বের মতো নেই।
দৌলতদিয়া রেল স্টেশন থেকে জানা যায়, দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত রেলের দুরুত্ব ৯৩ কিলোমিটার| রেলের লোকাল ভাড়া মাত্র ৩২ টাকা| দৌলতদিয়া থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলের দুরুত্ব ৮০ কিলোমিটার ভাড়া ধার্য্য মাত্র ২৭ টাকা। দৌলতদিয়া থেকে রাজবাড়ী ও পাচুরিয়া রেলস্টেশনের কোন টিকিট নেই।
দৌলতদিয়া টার্মিনালের বাস কাউন্টার থেকে মো. মজিবর রহমান জানান, কুষ্টিয়া পর্যন্ত লোকাল বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৯০ টাকা। দৌলতদিয়া রেল স্টেশনের যাত্রীদের সেবা বলতে কিছুই নেই। কখন ট্রেন আসবে ও ছেড়ে যাবে তা প্রচারের জন্য কোন মাইক নেই। যাত্রী ছাউনী ও রেল স্টেশনের বাউন্ডারী নেই। দৌলতদিয়া রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের পদ দীর্ঘদিন যাবত শূণ্য রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার জিল্লুর রহমান জানান, তিনি মুলত ফরিদপুর শিবরামপুর রেলস্টেশনের দ্বায়িত্বে রয়েছেন। পাচুরিয়া রেলস্টেশন থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে দৌলতদিয়া রেলস্টেশনের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। গোয়ালন্দ বাজার রেলগেইট এলাকায় রেলের স্টেশন মাস্টার ও গেইটম্যান নেই। ফলে যে-কোন সময় মারাত্বক দূর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। স্টেশনের নিরাপত্তা জনবল সংকটের কারণে স্টেশনের উপর প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের অবাধ বিচরণ চলছে।
দৌলতদিয়া রেলস্টেশনের হকার খলিল খা (৪০) জানান, ট্রেন নিয়মিত যাতায়াত না করায় স্টেশন এলাকায় এখন আর বেচাকেনা নেই। এলাকার হোটেল ব্যবসায়ও বন্ধের পথে। গোয়ালন্দ বাজার রেলস্টেশন থেকে গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) রেলস্টেশনের দুরুত্ব ৪ কিলোমিটার। এই রেলের অবস্থায় বর্ষা মৌসুমে এতই খারাপ যে ঘন্টায় ট্রেন চলাচল করে ৮-১০ কিলোমিটার গতিতে। রেলের স্লীপার ও পাথর নেই। কবে নাগাদ রেল লাইনের সংস্কার করা হবে তা কেউ বলতে পারছে না।
গোয়ালন্দের বাসিন্দা বিশিষ্ট সাংবাদিক এরশাদ জানান, ঐতিহ্যবাহী গোয়ালন্দ বাজার রেল স্টেশনে একসময় শত শত লাল পোষাকের কুলি কাজ করতো। এখানকার ইলিশ মাছ রাজশাহীসহ ভারতের কোলকাতা পর্যন্ত পরিবহন করা হতো। রাজশাহী থেকে আম, লিচু ভর্তি রেলেও ওয়াগান নিয়মিত গোয়ালন্দে আসতো। দীর্ঘদিন যাবত এই রেল স্টেশনের জনবল সংকটের কারণে রেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
দৌলতদিয়া রেলস্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার মো. জিল্লুর রহমান জানান, জনবলের সংকট রয়েছে। রেলের সার্বিক বিষয় ঢাকা রেল ভবন অবগত রয়েছে।
ভোরের আকাশ/র ই