ধোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে লোহাগাড়ার খেজুরগাছ, বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য

শীতের আগমনী বার্তা প্রকৃতিতে। তবে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার গ্রামীণ জনপদে হারিয়ে যেতে বসেছে শীতের অন্যতম ঐতিহ্য খেজুরের রস সংগ্রহের দৃশ্য। একসময় শীতের শুরুতে খেজুরগাছ প্রস্তুত করতে গাছিদের ব্যস্ততা চোখে পড়লেও এখন খেজুরগাছ ও গাছি—দুটিরই দেখা মেলা ভার। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ৪২টি চালু ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালির কারণে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ বৃক্ষসম্পদ।
একসময় খেজুরের রস দিয়ে তৈরি পিঠা ছিল শীতের অন্যতম আকর্ষণ। বিয়ের পর বেয়াইবাড়িতে শীতের পিঠার সঙ্গে খেজুরের রস পাঠানোর প্রচলনও ছিল। প্রায় ৩০ বছর আগেও সুগন্ধি খেজুরের রসে ভাপা পিঠা ডুবিয়ে খাওয়ার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে অমলিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য। শুধু খেজুরগাছ নয়, তাল, কাঁঠাল, বরইসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছও ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিধিবিধান থাকলেও কিছু ইটভাটার মালিক তা মানছেন না। পরিবেশ আইন অনুযায়ী গত দুই বছরে ছয়টি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আরও কয়েকটি ইটভাটা সচল রাখা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি গ্রামীণ বৃক্ষসম্পদ ও ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
উপজেলা ভূমি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লোহাগাড়ায় মোট ৪৪টি ইটভাটার মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাকি ৪২টি চালু ইটভাটার মধ্যে মাত্র একটির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। অন্যগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সবচেয়ে বেশি ইটভাটা রয়েছে চরম্বা ইউনিয়নে। সেখানে ২২টি ইটভাটা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় কার্যক্রম চালু থাকতে দেখা গেছে। তবে ভাটাগুলোর বৈধ কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপকেরা জানান, এ বিষয়ে মালিকপক্ষ ভালো বলতে পারবেন। প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ইটভাটাগুলো কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এসব ভাটার অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্রচলিত আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধুলাবালি বায়ুদূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও কৃষিজমির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে চরম্বা ইউনিয়নে ২২টি ইটভাটা থাকায় ওই এলাকার পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির আহমদ বলেন, বিবিবিলা গ্রামে তিনটি ইটভাটা রয়েছে, যা গ্রামবাসীর জন্য দুঃখের বিষয়। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ইতোমধ্যে নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু অভিযানের ঘোষণা নয়, ইটভাটাগুলোর কাগজপত্র যাচাই, নিয়মিত তদারকি এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটার বৈধ কাগজপত্র না থাকার তথ্য সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোন ইটভাটার কী ধরনের অনুমোদন বা ছাড়পত্র নেই, তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, লোহাগাড়ায় চালু ৪২টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র একটির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রচলিত আইন বাস্তবায়নে অবৈধভাবে পরিচালিত ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ভোরের আকাশ/সু.পা