জিআই পণ্য মধুপুরের আনারসে ফিরছে পুরোনো ঐতিহ্য

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারস দীর্ঘদিন ধরে স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। তবে অধিক লাভের আশায় কিছু অসাধু চাষির অতিরিক্ত রাসায়নিক ও হরমোন ব্যবহারে এ আনারসের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অনেক কৃষক এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধুপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অনেক চাষি আনারসের আকার বড় করা, রং উজ্জ্বল করা এবং মৌসুমের আগেই বাজারজাত করার জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক ও হরমোন ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে রমজানকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে ফুল আনার জন্য ‘সিজার’ নামে পরিচিত রাসায়নিক স্প্রে এবং পরে পাকানোর হরমোন ব্যবহার করা হয়। এতে আনারস দ্রুত বাজারজাত করা গেলেও স্বাদ, সুগন্ধ ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
তবে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ায় বিষমুক্ত আনারসের চাহিদাও বাড়ছে। এ সুযোগে অনেক কৃষক নিরাপদ আনারস চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
মধুপুর উপজেলার ফুলবাগচালা ইউনিয়নের হাগুড়াকুড়ি গ্রামের কৃষক সোহেল রানা তাদের অন্যতম। তিনি জানান, ২০২৫ সালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস-এর সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর নিরাপদ আনারস চাষ শুরু করেন। সংস্থার ৬০ হাজার টাকার অনুদান ও নিজস্ব অর্থায়নে চার বিঘা জমিতে ২৪ হাজার হানিকুইন জাতের আনারসের চারা রোপণ করেন।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে ১৮ মাসে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন এবং আরও প্রায় ৭০ হাজার টাকার আনারস বিক্রির আশা করছেন।
সোহেল রানা জানান, যেখানে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো বড় আকারের আনারস পাইকারিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে তার উৎপাদিত নিরাপদ আনারস প্রতি পিস ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “মধুপুরের আনারসের স্বাদ ও সুগন্ধ রক্ষা করতে আমরা অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করছি। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক কৃষক এখন নিরাপদ আনারস চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।”
তার দেখাদেখি স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান সবুজ, রনি মিয়া ও কল্যাণ ম্যাথিউসহ অনেকেই নিরাপদ আনারস চাষ শুরু করেছেন। বর্তমানে মধুপুর গড় অঞ্চলে প্রায় শতাধিক কৃষক এ পদ্ধতিতে আনারস উৎপাদন করছেন।
বাজারজাতকরণ প্রসঙ্গে সোহেল রানা জানান, দীর্ঘদিনের পরিচিত ক্রেতারা নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা থেকে সরাসরি তার ক্ষেত থেকে আনারস সংগ্রহ করেন। এছাড়া নিজের ফেসবুক পেজ ‘এস আর ব্লগ বিডি’র মাধ্যমে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আনারস পৌঁছে দিচ্ছেন।
প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকভাবে পাকানো আনারসের পার্থক্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাকৃতিকভাবে পাকা আনারসের নিচের অংশ হলুদ এবং উপরের অংশ সবুজ থাকে। কাটলে সুগন্ধ বের হয় এবং খেতে মিষ্টি লাগে। অন্যদিকে হরমোনে পাকানো আনারস সম্পূর্ণ হলুদ রঙের হলেও এতে স্বাভাবিক সুগন্ধ ও স্বাদ থাকে না।
এসএসএস-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ চন্দ্র পাল জানান, সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে মধুপুরের কৃষকদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। বর্তমানে ‘সাসটেইনেবল মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ সদস্যকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিরাপদ আনারস চাষ করে অনেক কৃষক স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আশেক পারভেজ বলেন, “মধুপুরে হানিকুইন, জায়ান্ট কিউ ও এমডি-২ জাতের আনারসের আবাদ হচ্ছে। অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভার, কিডনি ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের মাধ্যমে কৃষকদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষে উৎসাহিত করছে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে আনারস ও আনারসজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নিরাপদ আনারস উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব।
ভোরের আকাশ/জেআ