সিলগালা ভাঙার অভিযোগ
প্রশাসনের অভিযানেও থামছে না অনুমোদনহীন তেল বিক্রি

কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় জ্বালানি তেল বিক্রিকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠছে। সরকারি খাল ও উপকূলীয় নৌপথ ঘেঁষে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনুমোদনহীন তেল বিক্রয়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান, সিলগালা ও জরিমানার পরও থামেনি বিতর্ক। বরং সিলগালা করা কয়েকটি কেন্দ্র ফের খুলে তেল বিক্রির অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে—কার ছত্রচ্ছায়ায় চলছে এই তেল বাণিজ্য?
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থানীয় জেলেদের কাছে তেল বিক্রির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের একটি অংশ নৌপথে মিয়ানমারসহ অন্যত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট নৌপথে তেল পরিবহনের গতিপথ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১৯ আগস্ট তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে পাঁচটি লাইসেন্সবিহীন ভাসমান তেল বিক্রয়কেন্দ্র ও একটি তেলের দোকানসহ মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। একই অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
কিন্তু অভিযানের এক মাস না পেরোতেই সিলগালা করা কেন্দ্র ফের খোলার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযান কি শুধু লোক দেখানো? সিলগালা ভেঙে ব্যবসা চললে নজরদারি কোথায়?
সিলগালা ভেঙে ফের তেল বিক্রির অভিযোগ
সরেজমিনে কুতুবজোম-ঘটিভাঙ্গা সেতুর নিচে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি নেতা শাহেদ খানের মালিকানাধীন মেসার্স মদিনা ট্রেডিংয়ের সিলগালা করা স্থাপনার তালা খোলা রয়েছে। সেখানে থাকা এক কর্মচারী জানান, কয়েক দিন আগে তালা খোলা হয়েছে।তবে তেল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে ওই কর্মচারী দাবি করেন, পুরোনো হিসাবপত্র দেখার জন্য তালা খোলা হয়েছে; সেখানে তেল বিক্রি করা হচ্ছে না।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় একাধিক ব্যক্তির মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত তেল বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, রুকন উদ্দিন, রিমন মেম্বার, নজরুল ইসলাম ও জয়নালের মালিকানাধীন কয়েকটি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও তেল পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
তেলের সঙ্গে কি জড়িয়ে আছে পাচারচক্র?
তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা উপকূলীয় নৌপথ দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সময়ে এই নৌপথে তেলসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহনের অভিযোগে ফিশিং বোট আটক করেছে কোস্ট গার্ড। তেল পাচারের অভিযোগে আটকের ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করছেন।
এর আগে ১৯ আগস্টের প্রশাসনিক অভিযানের সময়ও স্থানীয়ভাবে অনুমোদনহীন তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর আড়ালে মিয়ানমারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পাচারের অভিযোগের কথা উঠে আসে।
তবে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হলে তেল সরবরাহের উৎস, বিক্রির হিসাব, নৌযানের গতিপথ, ক্রেতার পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হচ্ছে—স্থানীয় জেলেদের জন্য আসা জ্বালানি তেল যদি নৌপথে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে তার পেছনে কারা রয়েছে? সরকারি খাল ঘেঁষে দাহ্য তেলের ব্যবসা শুধু লাইসেন্সের প্রশ্নই নয়, কেন্দ্রগুলোর অবস্থান নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্র সরকারি খাল ও নৌপথসংলগ্ন এলাকায় ভাসমান বা অস্থায়ী স্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ ও বিক্রি করা হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
একটি দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন দ্রুত নৌযান, ঘাট ও আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ অনুযায়ী, নির্ধারিত বিধি ও লাইসেন্সের শর্ত ছাড়া পেট্রোলিয়াম আমদানি, পরিবহন, মজুদ বা বিতরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
তাই তাজিয়াকাটার এসব কেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু ‘লাইসেন্স আছে কি নেই’—এ প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। তেলের উৎস কোথায়, কত পরিমাণ তেল মজুদ হয়, কীভাবে পরিবহন হয়, কোথায় বিক্রি হয় এবং স্থাপনাগুলো কোন অনুমতিতে সরকারি খালের পাশে গড়ে উঠেছে—সবকিছুই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অবৈধ কেন্দ্র বন্ধ, বিপাকে শত শত জেলে
অন্যদিকে অনুমোদনহীন কেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা এলাকার মাছ ধরার ট্রলার ও ফিশিং বোটের মালিক-শ্রমিকরা।
এলাকায় পর্যাপ্ত বৈধ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র না থাকায় দূরবর্তী এলাকা থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, সময় এবং সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতির সময়।
তাজিয়াকাটার জেলে মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ‘এত বছর ধরে আমরা এই ঘাটের পাম্প থেকে তেল নিয়ে সাগরে যাচ্ছি। এখন প্রশাসন বন্ধ করায় বিভিন্ন জায়গা থেকে তেল সংগ্রহ করে সাগরে যেতে হচ্ছে। আমরা এত কিছু বুঝি না, টাকা দিয়ে তেল কিনি। এখানে বৈধ কোনো পাম্প স্থাপন করলে আমাদের জন্য ভালো হয়।’
জেলেদের বক্তব্য স্পষ্ট—অবৈধ তেল ব্যবসা তারা চান না; তারা চান বৈধ, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ।
অভিযান হয়, এরপর কী?
১৯ আগস্ট প্রশাসনের অভিযানে ছয়টি কেন্দ্র সিলগালা করা হলো। জরিমানাও হলো। কিন্তু পরবর্তীতে যদি সিলগালা করা স্থাপনার তালা খুলে যায়, তাহলে সেই সিলগালা কতটা কার্যকর? সিলগালা ভেঙে কেউ পুনরায় তেল বিক্রি করে থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযান চালানোর পাশাপাশি সিলগালা করা প্রতিটি কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হোক। কেন্দ্রগুলোর মালিকানা, লাইসেন্স, জ্বালানি সংরক্ষণের অনুমোদন, তেলের উৎস, ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব এবং পূর্বের জরিমানা বা মামলার তথ্য খতিয়ে দেখা হোক।
কারা সরবরাহ করছে, কোথায় যাচ্ছে—তদন্তের দাবি
স্থানীয় সমাজকর্মী মহি উদ্দিন বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে তেলকেন্দ্র সিলগালা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা তদন্ত করা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, “কোন কেন্দ্রের মালিক কে, কোথা থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়, কী পরিমাণ তেল আসে, কোথায় বিক্রি হয় এবং নৌপথে কীভাবে পরিবহন করা হয়—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। কোনো অংশ অবৈধভাবে দেশের বাইরে বা অন্যত্র পাচার হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
অভিযোগের বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন,তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সবিহীন ভাসমান তেলের দোকানগুলো সিলগালা করা হয়েছিল। কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি অবগত নন।
তিনি বলেন, সিলগালা করার পর যদি তারা পুনরায় কার্যক্রম চালু করে থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মহেশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবায়েত আহমেদ বলেন, সিলগালা ভেঙে যারা তেল বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুস সোলতান বলেন, অনুমোদনহীনভাবে তেল বিক্রি এবং তেল পাচারের অভিযোগে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈধ পাম্প চান জেলেরা, বন্ধ হোক অবৈধতার সুযোগ
কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙ্গার জ্বালানি বাণিজ্য এখন শুধু কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রের বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত জেলের জীবিকা, সরকারি সম্পদ, নৌপথের নিরাপত্তা, অগ্নিঝুঁকি এবং তেল পাচারের অভিযোগ।
একদিকে অনুমোদনহীন তেল ব্যবসা বন্ধ করা জরুরি, অন্যদিকে জেলেদের জন্য বৈধ ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাই এখন প্রয়োজন শুধু আরেকটি অভিযান নয়—প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, কারা এসব কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, কারা তেল সরবরাহ করে, কোথা থেকে তেল আসে, কোথায় যায়, সিলগালা ভেঙে কেউ ব্যবসা চালাচ্ছে কি না এবং স্থানীয় জেলেদের জন্য নির্ধারিত জ্বালানি পাচারের অভিযোগের পেছনে কোনো চক্র আছে কি না।
ভোরের আকাশ/আ.র