ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘিরে জমজমাট পিরোজপুরের কুড়িয়ানা

খালজুড়ে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, খালের বুকে যেন ভেসে চলছে সবুজ-হলুদের ক্যানভাস। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানায় এখন চলছে পেয়ারার ভরা মৌসুম। এ সময়ে সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর-কুড়িয়ানা খালে নৌকায় চলে পেয়ারার বেচাকেনা। দেশের অন্যতম পরিচিত ভাসমান পেয়ারা বাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ জনপদে এখন প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়।
প্রতি বছর জুলাই-আগস্টে এ অঞ্চলে পেয়ারা ও আমড়ার মৌসুম শুরু হয়। প্রতিদিন ভোর থেকেই আটঘর, কুড়িয়ানা এবং পিরোজপুর-ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী ভীমরুলীর ভাসমান হাটে জমে ওঠে কেনাবেচা। কৃষকেরা ছোট ছোট নৌকায় বাগান থেকে সদ্য তোলা পেয়ারা নিয়ে হাজির হন এসব হাটে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ট্রলার ও ডিঙি নৌকায় পেয়ারা বাগানের মাঝ দিয়ে ঘুরে উপভোগ করছেন খালের বুকজুড়ে জমে ওঠা এ ভাসমান বাণিজ্য। পাশাপাশি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনছেন তাজা পেয়ারা।
স্থানীয় কৃষক সুভাষ মণ্ডল বলেন, ‘প্রচুর পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের কারণে আমাদের আয়ও বেড়েছে। অনেকে নৌকা চালানো, হোটেল ব্যবসা ও গাইডিং সার্ভিস দিয়ে আয় করছেন। পেয়ারা বাগানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট হোটেল ও খাবারের দোকান। ফলে একদিকে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, অন্যদিকে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে।’
ঢাকার আদাবর থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক ফজলুল হক বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষায় ভাসমান হাটের এ দৃশ্য দেখতে আমরা বন্ধুরা মিলে এখানে আসি। খালের শান্ত জলে নৌকায় ঘুরে পেয়ারা বাগান দেখা এবং সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে তাজা পেয়ারা কেনার অনুভূতি এককথায় অসাধারণ। এমন ঐতিহ্যবাহী স্থান আরও যত্ন নিয়ে সংরক্ষণ করা দরকার।’
একই অভিমত বরগুনা থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী স্বপন আহমেদের। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। এখানে এসে অনেক কিছু জানার ও দেখার সুযোগ হয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পেয়ারা কেনা, নৌকায় ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা দারুণ।’
পেয়ারার মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। ভাসমান বাজারে পেয়ারা বেচাকেনার পাশাপাশি পর্যটন স্থানীয় মানুষের উপার্জনের বড় একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের খাল ও বাগান ঘুরিয়ে দেখাতে শত শত নৌকা ও ট্রলার চালক ব্যস্ত সময় পার করছেন। বেড়েছে তাদের আয়ও। এছাড়া কুড়িয়ানা বাজারের মিষ্টির দোকান ও স্থানীয় খাবারের হোটেলগুলোতেও পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
পর্যটকদের আগমন বাড়ায় খালের সরু নৌপথে যানজট ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও নৌ-পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেয়ারা বাগান ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য আটটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাগান এলাকায় লাউড স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি না করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বয়সী পর্যটককে শালীনতা বজায় রেখে চলাফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুমতি ছাড়া বাগানে প্রবেশ, পেয়ারা-আমড়া বা গাছের পাতা ছেঁড়া এবং যত্রতত্র নৌযান ভেড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজার এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নৌকা চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা চাই, এ স্থানটি শুধু পেয়ারা উৎপাদনের জন্য নয়, দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও দেশ-বিদেশে পরিচিত হোক।’
ভোরের আকাশ/সু.পা