মৃৎশিল্পী না হয়েও প্রতিমা তৈরিতে শিক্ষার্থী পলাশের চমক

বাবার ফার্ণিচারের ডিজাইনের কাজ দেখে ছোটবেলা থেকে বাবার হাতেই হাতেখড়ি হয় ছবি আঁকাআকির। সেই থেকেই ছবি আঁকাআকি প্রতি তার আগ্রহ। তার নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুই বছর ধরে নিজ বাড়িতে নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করছেন দেবী দুর্গার প্রতিমা। পেশাদার মৃৎশিল্পী না হয়েও টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রতিমা তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী পলাশ সূত্রধর।
পলাশ সূত্রধর (২৫) বাসাইল পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের রায়বাড়ি সূত্রধরপাড়ার পংকজ কুমার সূত্রধরের ছেলে। সে করটিয়া সরকারি সা'দত কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী।
জানা যায়, ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল পলাশের। সেই ছবি আঁকা যেন তার মনের মধ্যে গেঁথে আছে। সে যেকোন ব্যক্তির হুবহু ছবি আঁকাতে পারে। পলাশের স্বপ্ন ছিল ঢাকার কোন আর্ট স্কুল ও কলেজে ভর্তি হওয়ার–কিন্তু পরিবারেব আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় সে আশা পূরণ হয়নি। তার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। দুই বছর ধরে শখের বসে নিজ বাড়িতে তৈরি করছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। তার নিপুন হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে গণেশ, লক্ষ্মী, স্বরসতী, অসুর ও দেবী দুর্গা। তার হাতে তৈরি প্রতিমা দেখতে স্থানীয়রা ছুটে আসছেন। তার হাতের কারুকাজ দেখে সকলেই প্রশংসা করছে।
স্থানীয়রা জানান , পেশাদার কোনো বংশগত মৃৎশিল্পী না হয়েও এমন নিপুণ হাতের কাজ সত্যিই প্রশংসনীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তরুণদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মনের মধ্যে ইচ্ছে শক্তি থাকলে কোনো বাধাই যে আটকে রাখতে পারে না– তারাই প্রমাণ পলাশ। তরুণ প্রজন্মের এমন আত্মপ্রত্যয়ী প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে।
মৃৎশিল্পী পলাশ সূত্রধর বলেন, আমি করটিয়া সরকারি সা'দত কলেজের ইতিহাস বিভাগে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মাটির কাজ করেন মৃৎশিল্পীরা। আমাদের এটা পেশা না, আমরা অন্য সম্প্রদায়ের– আমরা সূত্রধর। আমি ছোট সময় থেকে ছবি আঁকাআকিতে আগ্রহী ছিলাম। মানুষের হুবহু ছবি আঁকাতে পারি। ছোটবেলা থেকেই আমার অভিজ্ঞতা ছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকেই দুই বছর ধরে নিজ বাড়ির পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করেছি।
তিনি বলেন, আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন বাবাকে বলতাম আমাকে নকশা আঁকিয়ে দাও। বাবা আমাকে নকশা আঁকিয়ে দিতো। বাবা ফার্ণিচারের নকশা করতেন সেই থেকে আমার আগ্রহটা বেড়ে যায়। স্বপ্ন ছিল বড় কোন আর্ট স্কুল ও কলেজে ভর্তি হওয়ার– কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় আমার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এবছর দুই মাস আগে থেকে প্রতিমা তৈরি শুরু করছিলাম। নিজেই সম্পূর্ণ প্রতিমা তৈরি করেছি । সম্পূর্ণ প্রতিমা মাটি দিয়েই তৈরি করেছি।
পলাশের বাবা পংকজ কুমার সূত্রধর বলেন, আমি একজন কাঠমিস্ত্রী। আমিও ছবি আঁকতে পারি। ছোটবেলা থেকে আমার ছেলে আকাঁআকি করতে পছন্দ করতো। যখন আমি বাড়িতে আসতাম আমাকে বলতো ছবি আঁকিয়ে দাও। তখন আমি আঁকিয়ে দিতাম। ছোটবেলা থেকেই আমার ছেলের ছবি আঁকাতে আগ্রহ ছিল। আঁকাআকির পাশাপাশি লেখাপড়াও করতেছে। আমি আমার ছেলেকে যে পর্যায়ের লেখাপড়া করার দরকার ছিল, আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় করাতে পারি নাই। আমার চিন্তা-ভাবনা ছিল আর্ট কলেজে পড়ানোর। টাকার যোগদান দিতে পারিনি এইজন্য পড়াতে পারিনি।
তিনি বলেন, দুই বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করছে। অনেকেই তার প্রতিমার কাজ দেখে প্রতিমা দেখতে আসছে। সবাই আমার ছেলের প্রংশসা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শিপন সূত্রধর বলেন, সে মৃৎশিল্পী না হয়েও প্রতিমা করছে। তার নিপুণ হাতের কাজ দেখে আমরা মুগ্ধ। আমরা সূত্রধর সম্প্রদায়, আমাদের এই পেশা না। আমরা জানতাম– সে ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকাআকি করতো। সেই প্রতিভা কাজে লাগিয়ে সে প্রতিমা তৈরি করছে। দুই বছরধরে নিজ বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করছে। তার প্রতিমা দেখলে মনে হবে একজন পেশাদার মৃৎশিল্পী প্রতিমা তৈরি করছে।
স্থানীয় এক মুরুব্বি মনিন্দ্র সূত্রধর বলেন, সে ছোটবেলা থেকেই যে কোন ব্যক্তির হুবহু ছবি আঁকতে পারে। সে তার নিজ বাড়িতে দুই বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করছে। প্রতিমা তৈরি করছে, কোন দিন কারও সাথে প্রতিমার তৈরির কাজ করেনি। তার মেধা ও প্রতিভা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিমা তৈরি করছে। তার প্রতিমা দেখে আমরা মুগ্ধ হচ্ছি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়ায় সে প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটে তুলেছে।
বাসাইল উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ভজন কুমার বিশ্বাস বলেন, বাসাইল পৌরসভার রায়বাড়ি সূত্রধর সম্প্রদায়ের ছেলে। কলেজ পড়ুয়া পলাশ সূত্রধর মৃৎশিল্পী না– তারা সূত্রধর সম্প্রদায়। ছেলেটি মৃৎশিল্পী না হয়েও যেভাবে প্রতিমা তৈরি করছে প্রশংসার দাবিদার। অসহায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করা ছেলেটির প্রতিভাকে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা দেয়। তাহলে পলাশ সূত্রধর অনেক দূর এগিয়ে যাবে। সে বাসাইলের জন্য ভবিষ্যৎ।
তিনি বলেন, ছেলেটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হোক । তাহলে সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। তার যে প্রতিভা ও বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে এই প্রতিমা তৈরির মাধ্যমে। সে মৃৎশিল্পী না হয়েও সুন্দর ডিজাইনের প্রতিমা তৈরি করেছে। অনেকেই তার প্রতিমা দেখতে আসছে। সরকার ও বিত্তবানদের প্রতি তার প্রতি সহানুভূতি কামনা করছি।
ভোরের আকাশ/সু.পা