রাজারহাটে হকারের চোখের অপারেশনের সম্পূর্ণ খরচ বহন করলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ

"আমারও দুটি চোখ আছে। কিন্তু জন্ম থেকেই ডান চোখে কিছুই দেখতে পাই না। বাম চোখেই ছিল আমার সব ভরসা।
সেই চোখেও ছানি পড়েছিল। ডাক্তার অপারেশন করতে বলেছিলেন, কিন্তু টাকার অভাবে করাতে পারিনি। ঝাপসা চোখ নিয়েই প্রায় ৩৫ বছর ধরে বাজারে বাজারে ঘুরে মানুষের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দিয়েছি।"
কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার পরিচিত পত্রিকা বিক্রেতা (হকার) মন্টু মিয়া (৫৫)। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় একমাত্র সচল চোখের ওপর নির্ভর করেই সংসার ও পেশা টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই চোখেও যখন অন্ধকার নেমে আসার উপক্রম, তখন অসহায় হয়ে পড়েন এই প্রবীণ হকার।
মন্টু মিয়া জানান, পত্রিকা বিক্রি করেই কোনোরকমে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালান তিনি। বয়সের ভার, পত্রিকার ক্রমহ্রাসমান চাহিদা এবং স্বল্প আয়ের কারণে চোখের অপারেশনের অর্থ জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রতিবন্ধী ভাতাই ছিল একমাত্র সরকারি সহায়তা। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার পাওনা বিলও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে।
তিনি বলেন, "নিরুপায় হয়ে একদিন একজন কলেজ শিক্ষকের কাছে আমার কষ্টের কথা বলি। তিনি কোনো দ্বিধা না করে আমার চোখের অপারেশনের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন। সেই টাকায় অপারেশন করাতে পেরেছি। এখন আবার পৃথিবীটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।"
মন্টু মিয়া জানান, তার পাশে দাঁড়ানো সেই মানবিক মানুষটি হলেন রাজারহাট মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মোখলেসুর রহমান পাটোয়ারী (বিপ্লব)। তাঁর সহযোগিতায় হারাতে বসা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে নতুন করে জীবনকে দেখতে শুরু করেছেন তিনি।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মন্টু মিয়া বলেন, "আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করি, তিনি যেন সুস্থ ও দীর্ঘায়ু হন। এই সময়ে এমন নিঃস্বার্থ মানুষ সত্যিই খুব কম দেখা যায়।"
মন্টু মিয়া রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেকুরটারী গ্রামের মৃত হামিদ আলীর ছেলে।
জানা গেছে, মো. মোখলেসুর রহমান পাটোয়ারী (বিপ্লব) রাজারহাটের ঐতিহ্যবাহী রাজারহাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক রমজান আলী পাটোয়ারীর সন্তান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছেন।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মোখলেসুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, "আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন ভবিষ্যতেও এভাবেই মানুষের সেবা করে যেতে পারি।"
একজন অসহায় হকারের চোখে আবারও আলো ফিরিয়ে দেওয়ার এই মানবিক উদ্যোগ রাজারহাটজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষরা এভাবে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বলবে।
ভোরের আকাশ/রই