টাঙ্গাইলে লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তি! আর্থিক ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা

টাঙ্গাইলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং জেলাজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট ও তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।ঘনঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে নাকাল হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের জনজীবন। প্রচণ্ড গরমের সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি কষ্ট পাচ্ছে। বিদ্যুৎ-নির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জানা যায়, জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২২৩ মেগাওয়াট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে দিনে ও রাতে দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট- এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১০ মেগাওয়াট।
অপরদিকে, গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি সরবরাহ পাওয়ায় জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ বা ২ ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। বাসাবাড়িতে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় গরমে দিনভর চরম অস্বস্তিতে থাকতে হচ্ছে সব বয়সী মানুষকে।
বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ঘুমাতে পারছেন না- যার প্রভাব পড়ছে তাদের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সরবরাহ, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।
এ দিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কোথাও ২৪ ঘণ্টা ৬ থেকে ৭ পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনই সেচ কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
একদিকে তীব্র গরম, অপরদিকে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এখন গ্রামের মানুষও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। শুধু লাইট জ্বালানো বা ফ্যান ঘোরানোর জন্য তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটর দিয়ে পানি তোলা, টিভি ও ফ্রিজ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ না থাকায় তারা বিপাকে পড়েছেন।
বাসাখানপুর গ্রামের মোবারক হোসেন জানান, একবার বিদ্যুৎ গেলে আর আসার খবর নেই। রাত ও দিন সমানভাবে লোডশেডিং দেওয়া হয়। রাতে ৫-৬ বার লোডশেডিং দেওয়া হয়। গরমে রাতে ঘুমানো যায় না।
বাঘিল গ্রামের আয়নাল সিকদার জানান, বিদ্যুৎ যায় না, মাঝেমধ্যে শুধু একটু আসে। উপজেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা ভালো থাকলেও গ্রামের অবস্থা আরও খারাপ। এ ছাড়া ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে বিদ্যুৎ বিলও বেশি আসছে।
এ দিকে বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে মিল-ইন্ডাস্ট্রিজ ও বড় বড় কলকারখানাগুলো। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেল চালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে জ্বালানি খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি জেনারেটর খরচ বহন করতে না পেরে সরাসরি লোকসানের মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানের ব্যাবসা-বাণিজ্যও।
এটিএম লুঙ্গি ফেব্রিক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীলিপ কুমার জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ আর উৎপাদন বন্ধ মানে লোকসান। দিনে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। দ্রুত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বড় অংশজুড়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে জেলার পোলট্রি খামারগুলো। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। তীব্র গরমে দম আটকে প্রতিদিন খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে ক্ষুদ্র খামারিরা বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
পোল্ট্রি খামারি নুরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের পোল্ট্রি সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তীব্র গরমে দম আটকে প্রতিদিন খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। দিনে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. ছানোয়ার হোসেন জানান, পল্লী বিদ্যুতের আওতায় জেলায় বিদ্যুৎ চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটের স্থলে সরবরাহ পাচ্ছেন ১১৩ মেগাওয়াট। ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওবাইদুল ইসলাম জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সাময়িক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।
ভোরের আকাশ/ইউএম