আখ চাষের সুখ্যাতি সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরাম

এক সময় ফেনীর মুহুরী ও কহুয়া নদীর চরাঞ্চলজুড়ে চোখে পড়ত আখের সবুজ ক্ষেত। বেলে-দোআঁশ মাটিতে ভালো ফলন হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের কাছে আখ ছিল অন্যতম লাভজনক ফসল। আখ থেকে তৈরি হতো সুস্বাদু গুড়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সেই গুড় বিক্রি হতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
পরবর্তীতে আখ চাষ ও গুড় তৈরিকে ঘিরে গড়ে ওঠে শত বছরের ঐতিহ্য। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, ন্যায্যমূল্যের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিসহ নানা সংকটে দিন দিন আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। এতে কমছে আখের আবাদও।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরশুরামে মাত্র ১৮ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে মির্জানগর ইউনিয়নে ১০ হেক্টর, চিথলিয়া ইউনিয়নে ৬ হেক্টর, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে ১ হেক্টর এবং পরশুরাম পৌরসভায় ১ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২৩০ জন কৃষক। আবাদ করা আখের মধ্যে ‘লোহামুলী’ জাতের ৮ হেক্টর এবং ‘২০৮’ জাতের ১০ হেক্টর আবাদ রয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, মুহুরী ও কহুয়া নদীর চরাঞ্চলের মাটি আখ চাষের জন্য উপযোগী হলেও আখের জমি দীর্ঘ সময় দখলে থাকে। একই জমিতে স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষ করে দ্রুত আয় করার সুযোগ থাকায় অনেকেই এখন অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এর সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, সার, সেচ ও জ্বালানি খরচ। মাড়াই ও গুড় তৈরির খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। আখ ও গুড়ের বাজারদরও সবসময় উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে না।
দক্ষিণ কাউতলী গ্রামের আখচাষি মনির আহমেদ বলেন, আগে আখ চাষ করে ভালো লাভ হতো। নিজের জমির আখ দিয়ে গুড় তৈরি করতাম, আবার বাড়তি আখও বিক্রি করতাম। এখন সার, শ্রমিক, ডিজেলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আখের দাম বাড়েনি। তাই অনেকেই আখ চাষ ছেড়ে অন্য ফসল করছেন।
চম্পকনগর গ্রামের আখচাষি কামাল উদ্দিন বলেন, আখের জন্য জমি প্রায় এক বছর ব্যবহার করতে হয়। অন্য ফসল করলে কয়েক মাসের মধ্যেই টাকা পাওয়া যায়। আখে সময় ও পরিশ্রম দুটোই বেশি। সরকার যদি বীজ, সার ও অন্যান্য সহায়তা দিত এবং ভালো দাম নিশ্চিত করত, তাহলে আমরা আবার বেশি জমিতে আখ চাষ করতাম।
দক্ষিণ কাউতলী গ্রামের গুড় উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিন, হুমায়ুন, নুরনবী, আজমীর ও নাজিম বলেন, একসময় আমাদের এলাকায় অনেক বাড়িতে গুড় তৈরি হতো। এখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এ কাজ করে। আগের মতো আখও পাওয়া যায় না। শ্রমিক ও জ্বালানির খরচ বেশি হওয়ায় গুড় তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গুড় বিক্রির জন্য সরকারি বা সমবায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা চান তারা।
গদানগর গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, আমাদের এলাকার মাটি আখ চাষের জন্য ভালো। তবে বাজারে আখ বিক্রি করতে অনেক টাকা গণ্ডি দিতে হয়। পরশুরাম বাজারে আখ নিয়ে আসলে বিক্রি হোক না হোক ৪০০ টাকা করে গণ্ডি দিয়ে দিতে হয়। সরকারি উদ্যোগে যদি চারা সরবরাহ, আধুনিক চাষপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন খরচ কমাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয় তাহলে আবারও আখের আবাদ বাড়ানো সম্ভব।
একই গ্রামের আখচাষি নুরুল আলম বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে আখ চাষ করছেন। এবার ২৮ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। এতে তার প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
ভোরের আকাশ/ এনউব