কাপ্তাই হ্রদ হয়ে অবৈধ সিগারেট পাচার, ডাম্পারসহ আটক ২

কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক ব্যবহার করে অবৈধ সিগারেট পাচারের একটি চালান আটকের ঘটনায় পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়ক ও জলপথকে চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাঙামাটির কাপ্তাই ব্যাটালিয়ন (৪১ বিজিবি) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের ইকো পার্ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮৩ লাখ টাকার অবৈধ সিগারেটসহ একটি ডাম্পার ট্রাক আটক করেছে। এ সময় দুজনকে আটক করা হয়।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইকো পার্ক এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি ডাম্পার ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে ১৭ হাজার ৯০ প্যাকেট প্যাট্রন (Patron) ও ১ হাজার ৮০০ প্যাকেট অরিস (Oris) সিগারেট উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সিগারেটের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৯০ প্যাকেট। এসব সিগারেটের আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৩ লাখ ৩ হাজার ৪০০ টাকা।
অভিযানে তৌহিদুল ইসলাম (২১) ও সাহেদুর ইসলাম নয়ন (২২) নামে দুজনকে আটক করা হয়। তৌহিদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নিশ্চিতপুর গ্রামের নাজিম উদ্দীনের ছেলে। সাহেদুর ইসলাম নয়ন শিলক গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে।
বিজিবি জানিয়েছে, সিগারেটের চালানটি সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কাপ্তাই লেক হয়ে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক দিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে রাঙ্গুনিয়ার ইকো পার্ক এলাকায় ডাম্পারসহ চালানটি আটক করা হয়।
একটি ডাম্পার ট্রাকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট পরিবহনের ঘটনায় চালানটির উৎস, গন্তব্য ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আটক দুজনের বাইরে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, সিগারেটগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছিল এবং কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কাপ্তাই লেক ও কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে জলপথ ও সড়কপথ মিলিয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধে উভয় রুটেই নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলা থেকে রাতের আঁধারে কাপ্তাই লেক ব্যবহার করে অবৈধ ভারতীয় সিগারেটের চালান বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। ওই সূত্রের অভিযোগ, পূর্ণ বিকাশ চাকমা নামে এক ব্যক্তি এসব চালান পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বিজিবি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, রাঙামাটির রাজবাড়ি, ভালেদী, পুরাতনবস্তী ব্রিজ, আসামবস্তি প্রযুক্তি এলাকা, নোয়াআদাম ও ব্যাঙছড়ি এলাকা হয়ে কাপ্তাই লেক ব্যবহার করে সিগারেট পরিবহন করা হয়। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের আড়ালে বিশেষভাবে তৈরি কাভার্ড ভ্যান ব্যবহার করে সিগারেট পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কিছু কাভার্ড ভ্যানে বাইরের বডির তুলনায় ভেতরে অতিরিক্ত জায়গা রেখে আলাদা বক্স তৈরি করা হয়। এসব বক্সে করে অবৈধ সিগারেট পরিবহন করা হতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কলেজ গেট এলাকার দুই তালিকাভুক্ত চোরাকারবারি সিগারেট পরিবহনের জন্য নতুন কাভার্ড ভ্যান তৈরি করেছেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে চোরাচালানকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সিগারেটের পাশাপাশি অস্ত্র ও গুলি পরিবহনের অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে উঠেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কাপ্তাই ব্যাটালিয়ন (৪১ বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত আভিযানিক টহলের মাধ্যমে চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাওসার মেহেদী বলেন, চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আটক দুজন, উদ্ধার হওয়া সিগারেট ও ডাম্পার ট্রাক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাঙ্গুনিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হলো—আটক চালানটির পেছনে থাকা সরবরাহকারী, পরিবহনকারী ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের শনাক্ত করা যায় কি না। তদন্তে চালানটির উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য বেরিয়ে এলে এই রুটে অবৈধ সিগারেট পাচারের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ভোরের আকাশ/জেআ