সোনাগাজীর চরাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। একদিকে বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাস, অন্যদিকে মেঘনা নদীর মোহনা ও উপকূলীয় প্রকৃতির বৈচিত্র্য। এসব এলাকায় বছরের পর বছর অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে কিংবা সীমিত পরিসরে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়।
প্রকৃতির এই বৈরিতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় একটি সম্ভাবনা—সৌরবিদ্যুৎ। প্রচুর সূর্যালোক, বিস্তীর্ণ খোলা জমি ও জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর তুলনামূলক নিকটবর্তী অবস্থান সোনাগাজীর বিভিন্ন চরাঞ্চলকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। পরিকল্পিতভাবে এসব জমি কাজে লাগানো গেলে শুধু ফেনীর বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ নয়, জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সোনাগাজী।
ইতোমধ্যে ৭৫ মেগাওয়াটের প্রকল্প
সোনাগাজীতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি উদাহরণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। পূর্ব বড়ধলী ও চরচান্দিয়া এলাকায় ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বিদ্যুৎ ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে মীরসরাই গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, উপকূলীয় এই অঞ্চলকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
আরও বড় প্রকল্পের উদ্যোগ
সোনাগাজীতে সম্ভাবনার পরিধি এখানেই শেষ নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য কয়েকশ একর জমি নিয়ে কাজ চলছে ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে চরাঞ্চলের অনাবাদি বা কম উৎপাদনশীল জমিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে জমির অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি উর্বর কৃষিজমির ওপর অতিরিক্ত চাপও কমানো সম্ভব হবে।
জলবায়ু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি
সোনাগাজীর চরাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের প্রসারের অন্যতম বড় সুবিধা হলো পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় সোনাগাজীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
তবে ফেনীর উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও দুর্যোগ সহনশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ
সোনাগাজীর চরাঞ্চলে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রকল্প নির্মাণের সময় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। প্রকল্প চালু হওয়ার পর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে এসব কাজে যুক্ত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। একই সঙ্গে প্রকল্পকেন্দ্রিক সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
জমি ও পরিবেশ নিয়ে সতর্কতা জরুরি
সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও। চরাঞ্চলের জমির মালিকানা, ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ, পরিবেশগত প্রভাব ও দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনা না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রকল্পের স্থান নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে সৌর প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণও বড় বিষয়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রবল বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি থেকে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষায় আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত জমি যেন পরিবেশ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সংযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না; সৌরবিদ্যুতের সুফল স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। চরাঞ্চলের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। সোনাগাজীর চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি অঞ্চল গড়ে তোলা গেলে সুফল আরও বাড়তে পারে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে উপকূলীয় বাতাসের গতি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাও যাচাই করা যেতে পারে।
হতে পারে উপকূলীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির মডেল
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, কৃষিতে সেচ ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়ছে। একই সময়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সোনাগাজীর চরভূমি দেশের বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
একসময় যে চরাঞ্চলকে অনাবাদি জমি হিসেবে দেখা হতো, পরিকল্পিত উদ্যোগে সেই চরাঞ্চলই আগামী দিনে হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সোনাগাজীর সূর্যের আলো তখন শুধু ফেনীর ঘর আলোকিত করবে না, জাতীয় অর্থনীতির অগ্রযাত্রায়ও যোগ করতে পারে নতুন শক্তি।
তবে এই সম্ভাবনাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাহলেই ফেনীর সোনাগাজী একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের অংশ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোরের আকাশ/সু.পা