রামগতির বয়ারচরের বাদশাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে মানববন্ধন

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পোলের গোড়া নামক স্থানের তছির আহম্মদের ছেলে ৩৮ বছর বয়সী বাদশাহ। একসময় ভাড়ায় চালিত সিএনজি ও মোটরসাইকেল থেকে টাকা তুলতেন। পরে একটি ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার থেকে ফিরে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে হয়ে যান বয়ারচরের মাফিয়া ডন।
এখন সবার কাছে তিনি ডাকাত বাদশা নামে পরিচিত। অর্ধশতাধিক জলদস্যু ও ডাকাত নিয়ে গড়েছেন বাহিনী। সে বাহিনীর প্রধান তিনি। দুর্গম বয়ারচরের মূর্তিমান আতঙ্ক এখন ডাকাত বাদশা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর রামগতির চরগাজী ইউনিয়নের বয়ারচরে তাণ্ডব চালায় বাদশার বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বয়ারচরের ব্রিজঘাট, তেগাছিয়া, নুরুল্লাহ সমাজ, সাহাবউদ্দিন বাজার, দক্ষিণ টুমচর, মীর সমাজ, আইয়ুব আলী সমাজ ও জাকের সমাজ এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি-ডাকাতি, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে মুক্তিপণ আদায়, জমি দখল সহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বাদশার বাহিনী।
নোয়াখালীর হাতিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর পালিত ডাকাত ‘বাদশা’ বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে বয়ারচরে গত তিন বছরে নানা অপরাধ করে এখনো বুক ফুলিয়ে রাস্তায় চলাফিরা করলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছেনা। তার বাহিনীতে রয়েছে দিদার, হালদার, মাকছুদ ও সাদ্দাম সহ অর্ধশতাধিক ডাকাত সদস্য।
বয়ারচরের প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বয়ারচর হলো বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী মেঘনার বুকে জেগে ওঠা একটি চর। ১৯৭০ সালের শেষদিকে এ চরে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া ও চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দস্যু বাহিনীর সৃষ্টি হয়। চরটি নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও হাতিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা। প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস এ চরে।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে একাধিক সশস্ত্র দস্যু ও লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে ওঠে। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার সীমানা সংক্রান্ত দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বিরোধের কারণে এই অঞ্চলে দস্যুদের দাপট ও অপরাধ কর্মকাণ্ড দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। দুটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও সেটি এখন নেই। আইনশৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণহীন এ চরটিতে ডাকাত ও জলদস্যু বাহিনীর রাজত্ব চলছে।
স্থানীয়রা জানান, রামগতি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল বয়ারচরে সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বিরাজ করে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভয়। একই সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত বাহিনীর তাণ্ডব, লুটপাট ও অস্ত্রের ভয়েও রাতের বেলায় ঘর থেকে বের হতে সাহস পান না অনেকে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, বয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় নারীরা যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক নারী কোনো না কোনো সময় যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন; এমনকি স্থানীয়দের কেউ কেউ এ সংখ্যা ৬০ শতাংশের কাছাকাছি বলে দাবি করছেন।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ধর্ষণের শিকার ৫ জন নারী জানান, বয়ারচরের বসবাসরত শতকরা ৬০ ভাগ নারী বাদশার লালসার শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ তিনবছর একটানা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আবার অনেক নারীকে বাদশা বছরের পর বছর স্বামী-স্ত্রীর মত ব্যবহার করছেন। এসব বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেনা। মুখ খুললে প্রাণ হারাতে হবে ডাকাত বাদশার হাতে এ ভয়ে সবাই নিরবে সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছে তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধর্ষণের শিকার তিনজন ভুক্তভোগী নারী জানান, রাত গভীর হলে বাদশা তাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় চায়। এসময় বাড়ির বাহিরে একাধিক লোকজন অস্ত্র নিয়ে পাহারা দেয়। এ সুযোগে ঘরে থাকা মেয়ে, বা ছেলের বৌকে সবার সামনে যৌন হয়রানি করে। চোখের সামনে এসব দেখেও সহ্য করে যাচ্ছেন তারা। তার চাহিদা পূরণ না করলে অস্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। তখন বাধ্য হয়ে তার চাহিদা পূরণ করতে হয়। দিনের বেলা কাউকে বললে তার বাহিনী এসে মেরে ফেলবে এ ভয়ে কেউ মুখ খুলছেনা। এমন অভিযোগ ওই চরের অন্তত ১০ জন নারীর ।
একাধিক নারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত পুলিশ বা প্রশাসনের সহায়তা পাওয়াও সম্ভব হয় না। কারণ: ওই চরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। দুটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও সেটিও ৫ আগস্টের পর সরিয়ে নেওয়া হয়৷ বর্তমানে চরটিতে বাদশাহ বাহিনী সহ কয়েকটি দস্যু বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাদশার নির্মম নির্যাতনের শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, গত ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বয়ারচরের দুই শতাধিক পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে বাদশা ও তার বাহিনী। মদ, গাঁজা ও ইয়াবা সহ নানান ধরনের মাদক সরবরাহ করে বাদশা। এ গ্রামগুলোর বিভিন্ন বসতবাড়িতে চুরি, ডাকাতি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
এছাড়া দক্ষিণ টুমচর গ্রামের ওমর ফারুক জানান, গত আগস্ট মাসে বাদশা ডাকাতকে গ্রেফতারের দাবিতে এলাকাবাসী একটি মানববন্ধন করেন। ওই মানববন্ধন বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে ফেসবুকে পোস্ট করার অপরাধে বাদশা ওমর ফারুককে প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধর করেন। পরে ওমর ফারুক বাদশার বিরুদ্ধে রামগতি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এসব ঘটনা ছাড়াও ডাকাত বাদশা ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে রামগতি, হাতিয়া, সুবর্ণচর ও চরজব্বর থানায় অসংখ্য মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ বেশ কয়েকবার আটক হয়েছেন বাদশা ও তার বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী এমপির লবিং ও তদবিরে বারবার ছাড়া পেয়ে শুরু করে আবারও তাণ্ডব।
রামগতি উপজেলা বিএনপি নেতা ও চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মীর আক্তার হোসেন বাচ্চু বলেন, বাদশা সহ আরও বেশ কয়েকটি দস্যু বাহিনীর তাণ্ডবলীলায় গোটা বয়ারচর আতঙ্কিত। ১৭ বছর করল আওয়ামী লীগ। এখন হঠাৎ শুনি বিএনপি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না থাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে বাদশা একক রাজত্ব করছে বিশাল এই চরকে। এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা সে করছেনা।
রামগতি উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দীন বলেন, বাদশাহ বিএনপির কেউ নয়। সে একজন চিহ্নিত অস্রধারী ডাকাত। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা হবে।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বাদশা বলেন, আমি কোনো অপকর্মে জড়িত নই। এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। গত আগস্ট মাসে নিরীহ মানুষকে ভুলবুঝিয়ে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে আমাকে এলাকা ছাড়া করা হয়। আমি আমার এলাকায় যেতে পারছিনা। এগুলো ওই এলাকার চিহ্নিত ডাকাতদের গডফাদার যারা রয়েছে, তারা করছে। আমি যাতে এলাকায় ঢুকতে না পারি।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, বলেন, দুর্গম বয়ারচরে বাদশা সহ আরও বেশ কয়েকটি জলদস্যু বাহিনী বেপরোয়া তাণ্ডব চালানোর খবর আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ওই চরে শক্তিশালী পুলিশ ক্যাম্প লাগবে।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, বয়ারচরটি হাতিয়া ও রামগতি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা। আগে সীমানা জটিলতার নিরসন করে ওই চরে পর্যাপ্ত পুলিশ দিয়ে একটি থানা স্থাপন করার জন্য কাজ চলছে। অল্প সময়ে বয়ারচরের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিবেন তিনি। এছাড়া ডাকাত বাদশা সহ দস্যু বাহিনীর তান্ডব বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে পুলিশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা