জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীঘীপাড়া কয়লাখনি চালুর দাবি

দেশের জ্বালানি সংকট ও আমদানি নির্ভরতা কমাতে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের দীঘীপাড়া কয়লাখনি বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে থাকা এই খনির কয়লা উত্তোলন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যবহার করা গেলে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে এ পর্যন্ত পাঁচটি কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব খনিতে ভূগর্ভে প্রায় ৩ হাজার ১৯৭ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘীপাড়া এবং রংপুরের খালাশপীর ও জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাখনি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে আবিষ্কৃত কয়লার মজুদ বিপুল। তাদের মতে, এই মজুদ প্রায় ৫৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের জ্বালানি সমতুল্য, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বিকল্প উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দিনাজপুরে আবিষ্কৃত তিনটি কয়লাখনির মধ্যে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘীপাড়া অন্যতম। শুধু দিনাজপুরের এসব খনিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে দীঘীপাড়া কয়লাখনিতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদের কথা বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
১৯৮৫ সালে বিওএইচপি নামের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকা নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। পরে ১৯৯৭ সালে লন্ডনভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানি ওই এলাকায় ১০৭টি কূপ খনন করে উন্নতমানের কয়লার সন্ধান পায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। ওই সমীক্ষায় প্রায় ৬ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে, নবাবগঞ্জ উপজেলার দীঘীপাড়া কয়লাখনি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর আবিষ্কার করে। দীর্ঘ সময় ধরে কয়েকটি কূপ খননের মাধ্যমে এখানে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ থাকার বিষয়টি যাচাই করা হয়।
পরবর্তীতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। সমীক্ষা শেষে চীনা একটি কোম্পানির মাধ্যমে দীঘীপাড়া কয়লাখনি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে ছিলেন বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির মাইনিং বিভাগের কর্মকর্তা মো. জাফর সাদিক। তিনি দীঘীপাড়া প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সমীক্ষা শেষে খনিটির বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা এবং আমদানি করা জ্বালানির ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় কয়লা উত্তোলন করা গেলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কয়লা ব্যবহার করে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। খনিটির প্রায় ৬ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১১৮ থেকে ৫০৬ মিটার গভীরতায় ছয়টি স্তরে প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০১ সাল থেকে ২০২২ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত খনিটি থেকে প্রায় আড়াই কোটি মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদনের তথ্য রয়েছে।
তবে ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কারণে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে মজুদের বড় অংশ উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ কয়লা ভূগর্ভে থেকে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমে আসতে পারে।
এ অবস্থায় রামপাল, পায়রা বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় কয়লা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দীঘীপাড়া খনিতে ওপেন মাইনিং বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনার কথাও বলছেন। তাদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে।
তবে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের জমি, বসতবাড়ি ও জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনার দাবি রয়েছে। বিশেষ করে ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়টি সামনে রেখে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমঝোতা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীঘীপাড়া কয়লাখনি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নতুন করে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নির্ধারণের আগে পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জীবিকার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
ভোরের আকাশ/সু.পা