খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন

‘স্বীকৃতি না দেওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত এক ধরনের জবরদস্তি করা হচ্ছে। আর যেখানে জবরদস্তি থাকে, সেখানেই তার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।’—আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে আয়োজিত আলোচনা সভায় এ কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল সুমন।
তিনি বলেন, আদিবাসীদের স্বীকৃতির দাবি কোনো সাময়িক বিষয় নয়। বছরের পর বছর এই দাবি আরও শক্তিশালী হয়েছে, দুর্বল হয়নি। কারণ বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখনো আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়নি। রাষ্ট্র যদি এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিত, তাহলে পুরো বিষয়টির প্রেক্ষাপটই ভিন্ন হতো।
রোববার (৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা শহরের চেঙ্গী স্কয়ারে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য র্যালি ও কালচারাল শোডাউন অনুষ্ঠিত হয়। পরে র্যালিটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিলনপুর মারমা উন্নয়ন সংসদে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রীতিময় চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ড. মাহমুদুল সুমন আরও বলেন, ‘পলিটিক্স অব রিকগনিশন’ বা স্বীকৃতির রাজনীতির বিষয়টি তিনি বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছেন। সময় যত গড়িয়েছে, আদিবাসীদের স্বীকৃতির দাবি ততই শক্তিশালী হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫তম সংবিধান সংশোধনীর সময় অনেক আদিবাসী অধিকারকর্মী আশাবাদী হয়েছিলেন—এবার হয়তো আদিবাসীরা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবেন। কিন্তু তখনও সেই স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। ফলে স্বীকৃতির দাবি দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
‘যতদিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না আসবে, ততদিন পর্যন্ত এই দাবি থাকবে এবং এটি আরও শক্তিশালী হতে থাকবে’—বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও শক্তি এর বৈচিত্র্যের মধ্যে। বাঙালির পাশাপাশি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক ও জীবনাচরণ দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
নিজের খাগড়াছড়ি আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, পথে বাসস্ট্যান্ডে বাঙালিদের পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষকে একই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছেন। একই বাসে সবাই একসঙ্গে যাত্রা করেছেন। এই দৃশ্য তার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক মনে হয়েছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে একটি বহুত্ববাদী সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে অনেক রকম মানুষ, অনেক রকম সংস্কৃতি ও অনেক রকম পরিচয় রয়েছে। এটিই আমাদের শক্তি।’
বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বিকাশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও এখন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসতি ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। এটি কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি দেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের সৌন্দর্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. মাহমুদুল সুমন বলেন, এ অঞ্চলের প্রসঙ্গ উঠলেই একটি পক্ষকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো প্রতিবেদন করার সময় শুধু একটি পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মতামত ও অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যখন প্রতিবেদন করা হয়, সেখানে অন্যান্য পার্বত্যবাসীর মতামত কেন নেওয়া হবে না? কেন এত একপেশে মতামত তুলে ধরা হবে?’
গণমাধ্যমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের লড়াই, সংগ্রাম, অধিকার আদায়ের আন্দোলন ও ত্যাগ যথাযথভাবে উঠে আসছে না। বরং অনেক সময় এমন একটি বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
‘এই ধরনের একপেশে ন্যারেশন সমাজে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে’—বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বয়ানের পেছনে অর্থনৈতিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। বিভাজনের এই ন্যারেশন ভাঙতে হলে পারস্পরিক যোগাযোগ, সংলাপ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়াতে হবে। আর এ ধরনের আয়োজন সেই বিভাজন দূর করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সাংস্কৃতিক আয়োজন শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি পরিচয়, অস্তিত্ব ও অধিকার প্রকাশেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নৃত্য, গান, পোশাক ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যত বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরা যাবে, পারস্পরিক বোঝাপড়া তত বাড়বে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তা উদযাপন করতে হবে। কারণ বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের শক্তি এবং এই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তারা বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকারকে অস্বীকার না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বীকৃতি ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করে।
সভায় বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা, লেখক ও গবেষক তানিম নওশাদ, বাংলাদেশ জনতা সংসদের সভাপতি মাহফুজুর রহমান, এইচডব্লিউএফের সভানেত্রী মায়া চৌধুরী, পানছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রত্না তঞ্চঙ্গ্যা, লিঙ্গুইস্টিক রিসার্চার খাইরুল নাহার ইপ্সিতাসহ আরও অনেকে।
দিনব্যাপী আয়োজনে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নৃত্য, গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
ভোরের আকাশ/এনউব