ঘোড়াঘাটে নদী থেকে শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সৎ বাবা গ্রেপ্তার

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদী থেকে উদ্ধার হওয়া কন্যাশিশু মুশফিকা আক্তার তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুটির সৎ বাবা শাফিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে শাফিউল তাসফিয়াকে নৌকায় করে করতোয়া নদীর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
নিহত তাসফিয়া রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মমিনুল ও লিজা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। ২০০৭ সালে তাদের বিয়ে হয়। তিন সন্তানের মধ্যে তাসফিয়া ছিল মেজো। ২০২৩ সালে মমিনুল ও লিজার বিবাহবিচ্ছেদ হলে লিজা ঘোড়াঘাটের শাফিউলকে বিয়ে করেন। পরে জীবিকার প্রয়োজনে তারা ঢাকায় বসবাস করতেন।
তাসফিয়ার জন্মদাতা বাবা মমিনুল তাকে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করান। ২০২৫ সালে মা লিজা তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। পরে পীরগঞ্জে লিজার বাবার বাড়ির কাছাকাছি একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয় তাকে। মেয়ের পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠাতেন লিজা।
পুলিশের ভাষ্য, শাফিউল অনিয়মিত রিকশা চালাতেন এবং নেশায় আসক্ত ছিলেন। নেশার টাকা জোগাড় করতে তাসফিয়ার জন্য পাঠানো খরচের টাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
পুলিশ জানায়, গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পীরগঞ্জের একটি মহিলা মাদ্রাসা থেকে তাসফিয়াকে ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ জুবাইদা বালিকা মাদ্রাসায় নিয়ে যান শাফিউল।
মাদ্রাসার পরিচালিকা রমিছার ভাষ্য অনুযায়ী, শাফিউল নিজেকে তাসফিয়ার সৎ বাবা পরিচয় দিয়ে শিশুটিকে সেখানে ভর্তি করানোর কথা বলেন। এ জন্য নিজের ও স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার কথা বলে সেদিন রাতে তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় রাখার অনুরোধ করেন তিনি। তবে তাসফিয়ার মা লিজা এতে সম্মতি দেননি।
তাসফিয়াকে আগের মাদ্রাসায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লিজা শাফিউলকে চাপ দিলে মোবাইল ফোনে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
পুলিশের দাবি, ১৬ আগস্ট রোববার সন্ধ্যার পর শাফিউল নিজের ও তাসফিয়ার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র মাদ্রাসায় রেখে ছবি তোলা এবং শিশুটির জন্য ট্রাঙ্ক কেনার কথা বলে তাসফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বের হন। মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজেও তাসফিয়াকে শাফিউলের সঙ্গে বের হতে দেখা গেছে।
এরপর তাসফিয়াকে আর মাদ্রাসায় ফিরিয়ে দেননি শাফিউল। পুলিশ জানায়, রাত প্রায় ৯টার দিকে তিনি শিশুটিকে নৌকায় করে করতোয়া নদীর মাঝখানে নিয়ে যান এবং সেখানে ফেলে দেন।
পরদিন সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদী থেকে লাল রঙের পোশাক পরা অবস্থায় তাসফিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার তদন্তে নেমে তাসফিয়ার সৎ বাবা শাফিউলকে সন্দেহ করে পুলিশ। পরে বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে শাফিউল তাসফিয়াকে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, তাসফিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে অনেকটাই কেটেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটনার দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
ভোরের আকাশ/জেআ